ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

নোবেল যুদ্ধ: জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শান্তির লড়াইয়ে এগিয়ে কারা?

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৫ জুলাই ২০২৫, ২:১১ বিকাল

Link Copied!

এক ঝড়ো বিকেলে, সুইডেনের স্টকহোম শহরের এক সুশোভিত কনফারেন্স হলে নোবেল ফাউন্ডেশনের বার্ষিক আয়োজনে একে একে নাম ঘোষণা হচ্ছিল। কোনো কণ্ঠ রুদ্ধ আহ্বান নয়, বরং এক একটি নাম যেন ইতিহাসের পাতায় আরও একটি সোনালি অধ্যায় সংযোজন। যিনি উঠে দাঁড়ালেন, হয়তো আজ থেকে কয়েক বছর আগেও তাঁর নাম কেউ জানত না। কিন্তু তাঁর গবেষণা, সাহিত্য বা শান্তির জন্য অবদান—আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনে আলো ছড়াচ্ছে। এই প্রতীকী মুহূর্তগুলো নোবেল পুরস্কারকে শুধু সম্মানজনকই নয়, বরং সময়ের সাক্ষী করে তোলে।

সেই ১৯০১ সালে আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার ভিত্তিতে যখন প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয়, তখন কেউ ভাবেনি এটি একদিন বিশ্বমানবতার প্রতীক হয়ে উঠবে। এক শতাব্দী পেরিয়ে, আজ নোবেল পুরস্কার কেবল ব্যক্তির কীর্তির স্বীকৃতি নয়, বরং একটি জাতির বৌদ্ধিক ও নৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন কোন দেশ এই আন্তর্জাতিক সম্মানে শীর্ষস্থান দখল করেছে, তার পেছনে রয়েছে গবেষণার বিনিয়োগ, শিক্ষার বিস্তার, উদ্ভাবনী মনোভাব এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকার।

যুক্তরাষ্ট্র: আধিপত্যের শীর্ষে
নোবেল পুরস্কার অর্জনের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র এতটাই এগিয়ে যে দ্বিতীয় স্থানের দেশের সঙ্গে তার ব্যবধান যেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। ২০২৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, এবং মানবাধিকার কর্মীরা মিলে প্রায় ৪২০টির বেশি নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার এসেছে পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং রসায়ন বিভাগে। কেন এই আধিপত্য?

একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো গবেষণা ও উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিনিয়োগ। MIT, Harvard, Stanford কিংবা Princeton-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, তারা গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের উদার পেটেন্ট আইন, গবেষণা অনুদানের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভাকে আকৃষ্ট করার নীতিমালা এই দেশকে করে তুলেছে নোবেলজয়ীদের স্বর্গরাজ্য।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাফল্য একমাত্র দেশীয় প্রতিভার উপর নির্ভর করে না। বিপুল সংখ্যক বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসী। জার্মানি, চীন, ভারত কিংবা রাশিয়া থেকে আসা প্রতিভাবান ব্যক্তিরা এখানকার ল্যাবগুলোতে নিজেদের মেধা খুলে ধরেছেন। এক অর্থে, যুক্তরাষ্ট্র নোবেল অর্জনে ‘গ্লোবাল ব্রেইন’ ব্যবহার করেছে।

যুক্তরাজ্য: ঔপনিবেশিক অতীত থেকে জ্ঞান-অর্জনের ভবিষ্যৎ
যুক্তরাজ্য নোবেল পুরস্কার অর্জনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও এর পুরস্কারের ধরণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যুক্তরাজ্যের বিজয়ীরা অপেক্ষাকৃত বেশি সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতিতে পুরস্কার পেয়ে থাকেন। উইনস্টন চার্চিলের মতো রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে হারল্ড পিন্টারের মতো নাট্যকার, কিংবা অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদ—যুক্তরাজ্যের নোবেলজয়ীদের বৈচিত্র্য চোখে পড়ে।

ইংরেজি ভাষাভাষী বিশ্বে যুক্তরাজ্যের সাহিত্যিক প্রভাব, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এবং সংবাদপত্র ও মিডিয়ার প্রভাব নোবেল কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছে। ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, জ্ঞান-বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জার্মানি: দর্শন, বিজ্ঞান ও শিল্পের দেশ
১৯২০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে নোবেল পুরস্কারে জার্মানির দাপট ছিল স্পষ্ট। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হিটলারের সময়ে দেশটি অনেক প্রতিভা হারিয়েছে, তবুও একবিংশ শতকে এসেও জার্মানি নোবেল তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাদের অর্জন অসাধারণ। আলবার্ট আইনস্টাইন, রিচার্ড কুন কিংবা রবার্ট কখ—এইসব নাম আজও অনুপ্রেরণা।

জার্মানির শক্তিশালী প্রযুক্তি খাত, পলিটেকনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন এই দেশকে টিকিয়ে রেখেছে। “Max Planck Institute” কিংবা “Fraunhofer Society” এর মতো সংস্থা গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতায় নিরবধি কাজ করে যাচ্ছে।

ফ্রান্স: সাহিত্য ও দর্শনের রাজধানী
ফরাসি লেখক, দার্শনিক এবং শান্তিকর্মীরা নোবেল পুরস্কার তালিকায় উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করেছেন। জ্যঁ পল সার্ত্র, আলবেয়ার কামু কিংবা মারি কুরি—এই নামগুলো শুধু পুরস্কারপ্রাপ্তই নন, তারা গোটা ইউরোপীয় চিন্তার ধারাকে প্রভাবিত করেছেন। ফ্রান্সে সাহিত্য ও দার্শনিক চর্চা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা নোবেল অর্জনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

ফরাসি ভাষা ও তার সাহিত্যিক বিশিষ্টতাও একটি বড় কারণ। অনেক সময় ইংরেজিভাষী না হলেও ফরাসি সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব এত গভীর যে তা নোবেল কমিটিকে চমৎকৃত করেছে।

জাপান ও রাশিয়া: এশিয়া ও ইউরোপের মেধার দ্বৈরথ
জাপানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা বিশেষত পদার্থবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে দারুণ অবদান রেখেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটি প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে, যার ফল ২০০০ সালের পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হিগস বোসনের প্রমাণ, স্টেম সেল রিসার্চ কিংবা জেনেটিক মেডিসিন—সবখানেই জাপানি গবেষকদের চিহ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সাহিত্য, পদার্থবিদ্যা ও অর্থনীতিতে নোবেল পেয়ে এসেছে বহু আগে থেকেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কারনে পশ্চিমা পুরস্কার প্রাপ্তি কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে। তথাপি, রাশিয়ার মেধা ও গবেষণার ঐতিহ্য এখনো বহাল।

অন্যান্য দেশ: শান্তির নোবেল, কানাডা, সুইডেন এবং বাংলাদেশ
শান্তির নোবেল পুরস্কার অনেক সময়ই দেশ বা সরকার নয় বরং আন্দোলন, সংগঠন কিংবা ব্যক্তি-মানবতাবাদীদের দেওয়া হয়। এর ফলে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা বা এশিয়ার অনেক ছোট দেশও পুরস্কার পেতে পেরেছে।

সুইডেন নিজেই এই পুরস্কার দেয় বলে এর নাগরিকরা কিছুটা সুবিধা পেয়েছেন—বিশেষত চিকিৎসা ও রসায়নে। কানাডা, সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া মধ্য-পর্যায়ের গবেষণায় ভালো পারফর্ম করছে।

বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকার জন্য শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। যদিও এই অর্জন গর্বের, তবে তা আরো প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তা আছে।

নোবেল পুরস্কার পাওয়া কোনো জাতির জন্য শুধু সাফল্য নয়, বরং দায়িত্বেরও প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে একটি দেশ কেমনভাবে চিন্তা করে, কেমনভাবে মানবতার কল্যাণে বিজ্ঞান, সাহিত্য, এবং শান্তির জন্য কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জার্মানির মতো দেশগুলোর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো—স্বাধীন চিন্তা, গবেষণায় বিনিয়োগ, এবং প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়া।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই তালিকা অনুপ্রেরণা হতে পারে। যদি গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানো হয়, তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তায় উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের মধ্য থেকেই আগামী নোবেলজয়ীরা উঠে আসবে।

কারণ প্রতিভা কোনো দেশের একচেটিয়া সম্পদ নয়। এটি বিকশিত হয় সুযোগ, পরিশ্রম ও মানবিক দায়বদ্ধতায়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস