
ফ্রান্স ও স্পেনে চলমান ভয়াবহ দাবানল শুধু মানুষের জীবন ও সম্পদই ধ্বংস করছে না, বরং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলকেও ‘ছাইয়ের মরুভূমিতে’ পরিণত করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই দাবানল বহু প্রাণীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে একটি বিরল ব্যাঙের প্রজাতি-ওয়েস্টার্ন স্পেডফুট টোড।
চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে দাবানল ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও স্পেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফ্রান্সে দুই লাখের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং চারজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। স্পেনেও আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু মানবিক সংকট নয়; একই সঙ্গে এটি একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়। বন্যপ্রাণী দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ এবং প্ল্যানিমালিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সেলিন সিসলার-বিয়েনভেনু বলেন, দাবানলে অসংখ্য প্রাণী পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও অনেকেই সময়মতো নিরাপদ স্থানে যেতে পারেনি। ফলে লক্ষ লক্ষ প্রাণী মারা গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বনভূমি অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে। জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের বিজ্ঞানী স্টেফান রাহমস্টর্ফ বলেন, উষ্ণ বায়ু মাটি ও উদ্ভিদ থেকে আর্দ্রতা শুষে নেওয়ায় বনভূমি অতি দাহ্য হয়ে উঠেছে। সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেই বড় দাবানলের সৃষ্টি হচ্ছে।
ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির প্রকৃতিবিদ গ্রেগোয়ার লোইস এই দৃশ্যকে ‘পম্পেইয়ের মতো ছাইয়ের মরুভূমি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
দাবানলের ফলে শুধু বনভূমিই ধ্বংস হচ্ছে না, ছোট ছোট প্রাণীর বেঁচে থাকার সুযোগও কমে যাচ্ছে। ঝোপঝাড় ও গাছপালা পুড়ে যাওয়ায় ছুঁচো, সজারু, টিকটিকি ও অন্যান্য ছোট প্রাণী সহজেই শিকারির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগুনে পোকামাকড় ধ্বংস হওয়ায় তাদের খাদ্যেরও সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাবানলের পর প্রাণীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ায় সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়ে যায়। এছাড়া আগুন নেভাতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ ও ছাই মাটি ও পানিকে দূষিত করে, যা প্রাণীদের খাদ্য, পানি এবং প্রজনন ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত সংকটাপন্ন প্রজাতি ওয়েস্টার্ন স্পেডফুট টোড (Pelobates cultripes) নিয়ে। দক্ষিণ ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের বন ও জলাভূমিতে বসবাসকারী এই নিশাচর উভচর প্রাণী ধীরগতির হওয়ায় দ্রুত আগুন থেকে পালাতে পারে না। শহরায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, বহিরাগত শিকারি প্রজাতির বিস্তার এবং সড়ক দুর্ঘটনার কারণে গত দুই দশকেই এদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে। নতুন এই দাবানল তাদের অস্তিত্বকে আরও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা কিছুটা আশার কথাও বলছেন। মাটির প্রায় এক মিটার গভীর গর্তে বসবাসের কারণে কিছু ব্যাঙ আগুন থেকে রক্ষা পেয়ে থাকতে পারে। ইতোমধ্যে পোড়া এলাকায় একটি সাধারণ ব্যাঙ জীবিত অবস্থায় দেখা যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, কিছু ওয়েস্টার্ন স্পেডফুট টোডও হয়তো বেঁচে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বনভূমিতে আবার সবুজ ফিরে আসতে পারে। কিন্তু বন্যপ্রাণীর সংখ্যা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দাবানলের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়তে থাকলে ইউরোপের জীববৈচিত্র্য আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।