
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু বছর ধরে তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে উচ্চ হারে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করে আসছে। কারণ এ ধরনের কর ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধি উভয় ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর। তাই আসন্ন অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাড ভেলোরেম কর পদ্ধতির পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘সুনির্দিষ্ট কর’ আরোপ করা আবস্যক।
আামাদের দেশে তামাক কর প্রশাসনের অন্যতম একটি সমস্যা হলো, জর্দা ও গুল থেকে কর আদায়ের কোন স্বীকৃত পদ্ধতি না থাকায় দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত এই পণ্য দুটি থেকে খুবই সামান্য কর আদায় হচ্ছে এবং এই খাতে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি হচ্ছে। তাই জর্দা ও গুল থেকে কর আদায়েরজন্য আধুনিক ও কার্যকর কর আদায় ব্যবস্থা চালু করা আবস্যক। আজ (০৪ জুন ২০২৬) বেলা ০৩ টায় অনলাইন সিটিং প্লাটফর্ম জুম-এ আয়োজিত “তামাকের কর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যে এর প্রভাব” শীর্ষক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা একথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এর সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এর সাবেক সমন্বয়কারি, সাবেক অতিরিক্ত সচিব হোসেন আলি খন্দকার ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এসএম আবদুল্লাহ।
ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির কাংখিত উন্নয়ন করেছে সেসব প্রায় সব দেশেই তামাকজাত দ্রব্যের ওপর ‘সুনির্দিষ্ট কর’ পদ্ধতির অনুসরণ করে। বাংলাদেশেও তামাকজাত দ্রব্যের ওপর ‘সুনির্দিষ্ট কর’ পদ্ধতির প্রচলন এখন সময়ের দাবী। পাশাপাশি সিগারেটের মূল্যস্তর ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে আসন্ন অর্থবছরে চারটি থেকে তিনটিতে নামিয়ে আনতে হবে। এই এই দুটি পদক্ষেপ নেওয়া হলে কর প্রশাসন সহজ হবে, কর ফাঁকির সুযোগ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে সিগারেট ও বিড়ি থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে কর ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে ও সরকার রাজস্ব হারোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি প্যাকেটে ইউনিক কিউআর কোড সংযুক্ত থাকলে উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত পণ্যের গতিপথ অনুসরণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে, উৎপাদন ও বিক্রয়ের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
তামাকজাত দ্রব্য বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় আনার গুরুত্ব তুলেধরে বক্তারা বলেন, তামাক তামাকজাত দ্রব্য বিক্রেতাদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে বিক্রয় মনিটরিং এবং অবৈধ ও কর-ফাঁকিকৃত পণ্য শনাক্ত করা সহজ হবে। বিক্রেতা নিবন্ধন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বক্তারা বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো সিগারেটের দাম বাড়ালে চোরাচালান বাড়বে বলে দাবি করে। কিন্তু স্বাধীন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এই দাবিকে সমর্থন করে না। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের অবৈধ সিগারেট বাজার মাত্র ১.৮ শতাংশ এবং এআরকে ফাউন্ডেশন পরিচালিত ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধ সিগারেটের বাজার মাত্র ৫.৬২ শতাংশ। তামাক কোম্পানিগুলো অবৈধ বাণিজ্যের পরিমাণ অতিরঞ্জিত করে কর বৃদ্ধি ঠেকানোর চেষ্টা করে।
ওয়েবিনারে অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ও উন্নয় কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার অর্ধশতাধিক মানুষ অংশ নেন।