ঢাকাবুধবার , ২৪ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষে বিপন্ন জনপদ

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৪ জুন ২০২৬, ১০:৩৬ সকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: ‘মোগো প্রেত্যেকের শইল্লে চুলকানি। খাউজাইতে খাউজাইতে ক্ষ্যাত হইয়া যাইতেছে। জ্বালাপোড়ায় আর বাঁচতে পারতেছি না। এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হওয়ার পর থেইক্কা এই সমস্যা। চুলকানিতে আমাগো মাইয়াগো চেহারা নষ্ট হই যায়। একারণে এহন এই গ্রামের মাইয়াগোরে কেউ বিয়াও করতে চায় না। শুধু খাউজানি চুলকানি না। কদিন পর পর আমাগো ডায়েরিয়া অয়। আরো কত সমস্যা যে মোগো জীবনসঙ্গী হইয়া গেছে বলে শেষ করা যাইতোনা।’

কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অংকুজান পাড়া এলাকার নারীরা। এসব নারীরা গত শনিবার (২০ জুন) বিকেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রসংলগ্ন নতুনপাড়া এলাকায় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’, ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’ এবং ‘পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটি’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক উঠান বৈঠকে অংশ নেন। ওই উঠান বৈঠকে ২১ জন নারীর মধ্যে ১৭ জনই জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে তাদের শরীরে তীব্র চর্মরোগ ও অ্যালার্জি বাসা বেঁধেছে।

নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অংকুজান পাড়া বর্তমানে এক ‘অভিশপ্ত জনপদ’পরিণত হয়েছে। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি গোটা জনপদের ধীরগতির মৃত্যুর প্রহর গোনা। এই হাহাকার কেবল একটি গ্রামের চিত্র নয়, এটি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠা এক ‘পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের’ জীবন্ত দলিল।

প্রকল্পের প্রেক্ষাপট:
বরগুনার তালতলী উপজেলার বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদের মোহনায় নির্মিত ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের আইসোটেক গ্রুপ ও চীনের পাওয়ার চায়না রিসোর্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সাথে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করে এই যৌথ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের শুরুতে দেশীয় প্রতিষ্ঠান আইসোটেক গ্রুপের ৪ শতাংশ মালিকানার কথা জানানো হলেও, বর্তমানে কেন্দ্রটির মালিকানা ও পরিচালনার বিষয়টি এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, বর্তমানে প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ মূলত চীনা কোম্পানি চায়না রিসোর্সের হাতেই চলে গেছে এবং আইসোটেক গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম অবশিষ্ট নেই।

জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিপর্যয়:
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া এবং কয়লা পরিবহনের সময় ছড়ানো ধূলিকণায় এখানকার বাতাস এখন ভারী। প্রতিটি শ্বাস নেওয়ার সাথে যেন ফুসফুসে প্রবেশ করছে বিষ। তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের মতে, গত দুই মাসে হাঁপানি ও চর্মরোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

ইদ্রিস আলী নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ‘সরকার বিদ্যুৎ দিল ঠিকই, কিন্তু আমার ৫ বছরের শিশুটি আজ শ্বাসকষ্টে ধুঁকছে। ওর শরীরের চামড়া লাল হয়ে উঠে গেছে। চর্মরোগের কারণে গ্রামে এখন বিয়ের বাজারেও নারীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা আমাদের সামাজিক জীবনকে পঙ্গু করে দিয়েছে।’

নদী ও মৎস্য সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি:
পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনায় অবস্থিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কেবল স্থলভাগেই বিষ ছড়াচ্ছে না, বরং নদীকেও ধ্বংস করছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত গরম পানি এবং উৎপাদিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।

স্থানীয় জেলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এই নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত। এখন জাল পাতলে মাছের বদলে ওঠে ময়লা আর মরা মাছ।’ এভাবে চলতে থাকলে উপকূলের এই মৎস্য ভাণ্ডার অচিরেই নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলী জানান, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ভারী ধাতু যেমন—পারদ, ক্যাডমিয়াম ও সীসা পানিতে মিশে মাছের জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে পায়রা-বিষখালী নদীর ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রগুলো আজ ধ্বংসের মুখে।’

টেংরাগিরি বনাঞ্চল ও কৃষি জমির অস্তিত্ব সংকট:

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মাত্র ৬.৪ কিলোমিটারের মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন ‘টেংরাগিরি’ (ফাতরার বন) অবস্থিত। পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, চিমনির বিষাক্ত ধোঁয়া এবং ছাই বনের গাছপালার সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাসুদুর রহমান জানান, কয়লার ছাই থেকে নিঃসরিত থোরিয়াম ও ফসফরাসের মতো গ্যাস মাটির অম্লতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কৃষিজমি তার স্বাভাবিক উর্বরতা হারাচ্ছে। এই হারে দূষণ চলতে থাকলে তালতলী অদূর ভবিষ্যতে এক মরুভূমিতে পরিণত হবে।

শুভসন্ধ্যা সৈকতের মৃত্যু ও পর্যটন বিপর্যয়:
তালতলীর পায়রা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত ‘শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত’ ছিল কুয়াকাটার মতো একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা। কিন্তু এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পরিবেশকর্মী মো. আরিফুর রহমান জানান, ‘বালু উত্তোলনের ফলে সৈকতের অর্ধেকের বেশি আজ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এটি কেবল পর্যটন স্পট নয়, এটি ছিল স্থানীয়দের আয়ের প্রধান উৎস। ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীও ধ্বংস হয়ে গেছে।’

জমি ও বসতভিটা হারানোর আর্তনাদ:
প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় ৮১ একর জমির বিপরীতে ৩১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যা ছিল স্থানীয় ভূমিহীন, রাখাইন ও প্রান্তিক কৃষকদের শেষ আশ্রয়স্থল।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্প ঘিরে ভূমিদস্যুতার যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা নজিরবিহীন। পটুয়াখালী দুদক কার্যালয়ে ইতিমধ্যে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয় রাখাইন অধিবাসী চোথাই ফ্রু মাতুব্বর জানান, ‘আমার ৫ একর জমি কেনার কথা বলে জালিয়াতির মাধ্যমে আরও ২০ একর জমি জোর করে দখল করা হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলার শিকার হয়েছি।’

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা:
প্রকল্পের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হোসাইন একসময় দাবি করেছিলেন, পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের আইএফসি ইএইচএস মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। আইসোটেক গ্রুপের এমডি মো. মঈনুল আলম পরিবেশগত নিয়ম মানার অঙ্গীকার করলেও তার কোনো প্রয়োগই মাঠে নেই। খোলা নৌযানে কয়লা পরিবহন, বর্জ্য পরিশোধনে ব্যর্থতা এবং মনিটরিং সেলের অকার্যকারিতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

সরকারি কর মওকুফ:
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি। যখন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নদী দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগের পাহাড় জমেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তৎকালীন সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ ১ হাজার ২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার কর মওকুফ করে দেয়। জনস্বার্থবিরোধী ও পরিবেশবিনাশী একটি প্রকল্পে এমন বিশাল অংকের কর সুবিধা দেওয়া স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত:
পরিবেশ ও জলবায়ু সাংবাদিক এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘পুরো বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, আমরা তখন পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লা প্রকল্পে আটকে আছি। বিদেশি কোম্পানি এখানে যে দূষণ করছে, তা তাদের নিজেদের দেশে কল্পনাতীত।’

এসব বিষয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

কবিরহাটে ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

প্রবাসীদের জন্য নতুন ব্যাংক হিসাব সুবিধা চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

আরও বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, ফ্রান্সে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু

নরসিংদীতে ট্রাক-নসিমনের মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক নিহত

দেশের বাজারে সোনার দামে বড় পতন, ভরিতে কমলো কত?

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষে বিপন্ন জনপদ

Phoenix Summit 2026 Set to Kicks Off with Intensive Cyber Security Workshops

ইনটেনসিভ সাইবার সিকিউরিটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে শুরু হতে যাচ্ছে ফিনিক্স সামিট ২০২৬

PROGGA Calls for Investing Increased Health Budget for NCD Control

বর্ধিত স্বাস্থ্য বাজেট অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগের আহ্বান প্রজ্ঞার

realme Celebrates World Cup Campaign offering Exclusive Rewards