
বিপ্লব হোসাইন: বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ দিন দিন আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতার বিকল্প নেই।

সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ২৬টি দেশে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউএনইপি সাধারণ মানুষের জন্য ঘর ও শরীর ঠান্ডা রাখার নয়টি কার্যকর পরামর্শ প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহ শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং খোলা আকাশের নিচে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
আগাম প্রস্তুতি নিন
প্রচণ্ড গরম শুরু হওয়ার আগেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও তাপপ্রবাহের সতর্কতা সম্পর্কে খোঁজ রাখা উচিত। একই সঙ্গে ফ্যান, রেফ্রিজারেটর ও অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে আশ্রয় নেওয়ার মতো শীতল স্থানও আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা ভালো।
ঘরে সূর্যের তাপ ঢুকতে দেবেন না
দিনের বেলায় সূর্যের দিকে থাকা জানালার পর্দা, ব্লাইন্ড বা শাটার বন্ধ রাখলে ঘরের তাপমাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শামিয়ানা, বাঁশের পর্দা কিংবা গাছের ছায়াও সূর্যের তাপ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
রাতের দিকে বাইরের তাপমাত্রা কমে গেলে জানালা খুলে ঘরের গরম বাতাস বের করে দিতে এবং সকালে আবার জানালা বন্ধ করে ঠান্ডা বাতাস ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এয়ার কন্ডিশনার না থাকলেও মিলতে পারে স্বস্তি
ইউএনইপির মতে, এয়ার কন্ডিশনার জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষা করতে পারে। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই যেখানে সম্ভব সেখানে ফ্যান, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল, ছায়া, শীতল ছাদ এবং পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা উচিত।
পর্যাপ্ত পানি পান ও হালকা খাবার
গরমে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত অল্প অল্প করে পানি পান করা জরুরি। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে এবং ভারী খাবারের পরিবর্তে সালাদ, ফলমূল বা সহজপাচ্য ঠান্ডা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাইরে বের হলে নিন বাড়তি সতর্কতা
প্রচণ্ড রোদে বাইরে বের হলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক, চওড়া কিনারাযুক্ত টুপি ও সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত। দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে সকাল বা সন্ধ্যায় বাইরের কাজ সম্পন্ন করাই নিরাপদ।
যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তাদের জন্য নিয়মিত বিরতি, পর্যাপ্ত ছায়া, ঘন ঘন পানি পান এবং কাজের সময়সূচি সমন্বয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে ইউএনইপি।
হিট এক্সহশন ও হিট স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন
মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত ঘাম এবং পেশিতে খিঁচুনি হিট এক্সহশনের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত শীতল স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে এবং পানি পান করতে হবে।
অন্যদিকে বিভ্রান্তি, জ্ঞান হারানো, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, খিঁচুনি কিংবা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া হিট স্ট্রোকের লক্ষণ। এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
দ্রুত শরীর ঠান্ডা করুন
ঠান্ডা পানিতে গোসল, ঘাড় ও কব্জিতে ভেজা কাপড় রাখা, ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে রাখা কিংবা ঘাড়, বগল ও কুঁচকিতে কুল প্যাক ব্যবহার করলে দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমানো সম্ভব।
প্রয়োজনে শীতল আশ্রয়ে যান
বাড়ি অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে লাইব্রেরি, শপিং সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল, পার্ক বা অন্যান্য শীতল স্থানে কিছু সময় কাটানো যেতে পারে। অনেক শহরে তাপপ্রবাহের সময় বিশেষ শীতলীকরণ কেন্দ্রও চালু করা হয়।
এ ছাড়া গাছপালা, পার্ক ও সবুজ এলাকা পরিবেশকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। তাই ছায়াযুক্ত পথ ব্যবহার ও সবুজ পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের খোঁজ রাখুন
বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, একা বসবাসকারী এবং বাইরের কর্মীরা তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই তাদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনে সহায়তা করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউএনইপি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ এখন আর সাময়িক ঘটনা নয়; এটি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাই গরমের আগে ও গরম চলাকালে ছোট ছোট সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণই তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।