
হাসান মাহমুদ: বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় আতঙ্ক যক্ষ্মা বা টিবি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই প্রাণঘাতী ব্যাধি মোকাবিলায় নানা ধরণের ওষুধ ও ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হয়ে আসলেও রোগটির জীবাণুর অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্রচলিত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। তবে গত শনিবার (৪ জুলাই) জনস হপকিন্স মেডিসিন থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফল চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ‘নাজাল ডিএনএ ভ্যাকসিন’ উদ্ভাবন করেছেন, যা নাকে স্প্রে হিসেবে প্রয়োগ করা যাবে এবং এটি যক্ষ্মার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
গবেষণার প্রেক্ষাপট:
জনস হপকিন্সের গবেষকদের মতে, যক্ষ্মার জীবাণু মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস অত্যন্ত ধূর্ত। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পটু এবং অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা এড়িয়ে ফুসফুসের টিস্যুর গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে জনস হপকিন্স মেডিসিনের একদল বিশেষজ্ঞ দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। তাদের উদ্ভাবিত এই ডিএনএ ভ্যাকসিনটি সরাসরি ফুসফুসের সংক্রমণের কেন্দ্রে পৌঁছে কাজ করতে সক্ষম। এটি মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলে, যাতে তা যক্ষ্মার লুকানো জীবাণুগুলোকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে।
ভ্যাকসিনের কর্মপদ্ধতি:
সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, যা রক্তপ্রবাহে কাজ করে। কিন্তু যক্ষ্মার ক্ষেত্রে ফুসফুসের স্থানীয় ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করা বেশি জরুরি। জনস হপকিন্সের বিজ্ঞানীরা সেই লক্ষ্যেই তৈরি করেছেন এই ‘নাজাল ডিএনএ ভ্যাকসিন’। এর প্রধান উদ্ভাবনী দিকগুলো হলো-
সরাসরি ফুসফুসে প্রয়োগ: নাকে স্প্রে করার মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন সরাসরি শ্বসনতন্ত্রের মাধ্যমে ফুসফুসের ভেতরে পৌঁছায়, যেখানে যক্ষ্মার জীবাণুগুলো বাসা বাঁধে। এতে দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে।
লুকানো জীবাণু নিধন: অ্যান্টিবায়োটিক অনেক সময় ফুসফুসের টিস্যুর গভীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত জীবাণুকে খুঁজে পায় না। এই ভ্যাকসিনটি শরীরের টি-সেলগুলোকে এমনভাবে উদ্দীপ্ত করে যে, তারা ওই সুপ্ত জীবাণুগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে পারে।
প্রদাহ হ্রাস: যক্ষ্মা ফুসফুসে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভ্যাকসিনটি ফুসফুসের প্রদাহ কমিয়ে টিস্যুর ক্ষতি অনেকাংশেই কমিয়ে আনে।
গবেষণার ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল:
প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় অভাবনীয় সাফল্য দেখা গেছে। জনস হপকিন্সের ল্যাবে যক্ষ্মায় আক্রান্ত প্রাণীদের ওপর যখন এই ডিএনএ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়, তখন দেখা যায়, সংক্রমণের তীব্রতা অনেক দ্রুতগতিতে কমে আসছে। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর প্রাণীদের শরীর থেকে যক্ষ্মার জীবাণু পরিষ্কার হওয়ার হার ইনজেকশনের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো—রোগটির ফিরে আসার সম্ভাবনা বা ‘রিল্যাপস’ হার হ্রাস করা। যক্ষ্মার চিকিৎসায় রিল্যাপস একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, কারণ রোগটি একবার সারার পর দ্বিতীয়বার ফিরে এলে তা সাধারণত বেশি শক্তিশালী হয়। এই নাজাল স্প্রে সেই ঝুঁকিকে প্রায় নগণ্য করে দিতে পারে।
ওষুধ প্রতিরোধী টিবি ও নতুন সম্ভাবনা:
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবি (এমডিআর-টিবি) এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে না। জনস হপকিন্সের গবেষকরা তাদের পরীক্ষায় দেখেছেন, এই নাজাল ভ্যাকসিনটি প্রচলিত যক্ষ্মা প্রতিরোধী ওষুধগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে একধরণের ‘সহায়ক অস্ত্র’ হিসেবে কাজ করছে। এটি ওষুধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমন্বিতভাবে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে, যা আগে কখনো সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশে যক্ষ্মার পরিস্থিতি:
বাংলাদেশ বিশ্বের উচ্চ যক্ষ্মাপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। যদিও সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের ফলে মৃত্যুহার কমেছে, কিন্তু সুপ্ত যক্ষ্মা এবং ওষুধ প্রতিরোধী টিবি এখনো নির্মূল করা যায়নি। আমাদের দেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যক্ষ্মা দ্রুত ছড়ায়। এই নাজাল ভ্যাকসিনটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল যদি মানুষের শরীরে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এক পরম আশীর্বাদ হবে। কারণ, ইনজেকশনের চেয়ে নাকের স্প্রে প্রয়োগ করা অনেক বেশি সহজ, ঝামেলাহীন এবং এর জন্য বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হবে না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
বিজ্ঞানীরা এখন এই ভ্যাকসিনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। ল্যাবরেটরির সফলতা থেকে মানুষের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পৌঁছানো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তারা মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হতে পারে। এই ভ্যাকসিনের উন্নয়ন যক্ষ্মা নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।