
১৯৫০ সালের কোরিয়ান যুদ্ধের উত্তপ্ত দিনে, যখন জল, স্থল ও আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি—বিশ্বের একেকটি রাষ্ট্র নিচের জগতেও আধিপত্য কায়েমে ব্যস্ত। সেই নিচের জগতটি হল সমুদ্রের গভীরে—যেখানে ভেসে বেড়ায় ভয়ংকর ও নীরব যুদ্ধযন্ত্র: সাবমেরিন। এগুলোর অস্তিত্বই যেন গোপন এক শ্বাসরুদ্ধকর যুদ্ধের প্রতীক, যেখানে পৃষ্ঠদেশের রাজনীতি আর প্রচার-প্রচারণার বাইরে চলে এক ভিন্ন খেলা।
বিশ্বজুড়ে সামরিক ভারসাম্য এবং আধিপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে সাবমেরিন। এগুলো শুধু হামলা ও প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয় না, বরং এগুলো গোয়েন্দাগিরি, নজরদারি, পরমাণু অস্ত্র বহন এবং স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানে শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক কালের যুদ্ধপ্রযুক্তিতে সাবমেরিনের গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে, অনেক রাষ্ট্রই এই শীতল যুদ্ধের নীরব সৈনিকদের পেছনে বিপুল বাজেট বরাদ্দ করছে।
সাবমেরিন বহরের দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্যতম সামরিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কাছে রয়েছে মোট ৭০টি সাবমেরিন। এর মধ্যে আছে ‘ওহাইও’ শ্রেণির পরমাণু সাবমেরিন, যা একাই ধ্বংস করতে পারে একটি গোটা শহর। এই সাবমেরিনগুলো শুধুমাত্র আক্রমণ বা প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয় না, বরং এদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গভীর সমুদ্রেও আধিপত্য কায়েম রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া। তাদের হাতে রয়েছে ৬৩টি সাবমেরিন। রাশিয়ার সাবমেরিন বহরের ইতিহাস দীর্ঘ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত পরিপূর্ণ। তাদের ‘Typhoon’ ও ‘Borei’ শ্রেণির সাবমেরিনগুলোর নাম শুনলেই সামরিক বিশ্লেষকদের মনে কেঁপে ওঠে। রাশিয়া তার সাবমেরিন বহরকে কেন্দ্র করেই একটি শক্তিশালী ‘second strike’ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা যেকোনো পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতিতে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যাদের হাতে রয়েছে ৬১টি সাবমেরিন। চীন তার সাবমেরিন বহরকে যেমন সংখ্যায় বাড়িয়েছে, তেমনি প্রযুক্তিগত দিক থেকেও আধুনিকায়ন করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে বেইজিং যেভাবে সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়—তারা শুধু স্থলভাগেই নয়, সমুদ্রের তলদেশেও আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া।
এই তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইরান, যাদের রয়েছে ২৫টি সাবমেরিন। মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলকভাবে কম বাজেটের দেশ হওয়া সত্ত্বেও, ইরান সাবমেরিনের দিক থেকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে গিয়ে তারা সাবমেরিনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইরানি সাবমেরিনগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ক্ষুদ্র আকারের হলেও, এগুলো শত্রু নৌবাহিনীকে চমকে দিতে যথেষ্ট।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে জাপান। শান্তিপূর্ণ সংবিধানের দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও, জাপানের সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত। তাদের রয়েছে ২৪টি সাবমেরিন, যা আধুনিক সেন্সর, নীরব ইঞ্জিন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ক্ষমতাসম্পন্ন। জাপান মূলত চীনের হুমকি মোকাবেলায় এই বহর গড়ে তুলেছে।
এরপর রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, যাদের হাতে রয়েছে ২২টি সাবমেরিন। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঠেকাতে দক্ষিণ কোরিয়া তার নৌবাহিনীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সাবমেরিন হলো সেই প্রতিরক্ষার অদৃশ্য ঢাল, যা শত্রুর আক্রমণের আগেই তাকে শনাক্ত করতে পারে।
ভারতের অবস্থান সপ্তম। ভারত তার ১৮টি সাবমেরিন দিয়ে কেবলমাত্র পাকিস্তানকেই নয়, বরং চীনকেও কৌশলগত বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের ‘Arihant’-শ্রেণির পরমাণু সাবমেরিন বর্তমানে একটি বড় কৌশলগত উন্নতি হিসেবে ধরা হয়, যেটি দেশটির ‘nuclear triad’ সম্পূর্ণ করে।
উত্তর কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের কাছেও রয়েছে ১৩টি সাবমেরিন। যদিও এগুলোর অনেকগুলোই পুরনো, কিন্তু উত্তর কোরিয়া এগুলোর ব্যবহার করে নানাভাবে হুমকি তৈরি করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
তুরস্কের ১৩টি সাবমেরিন মূলত NATO এর অংশ হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী এই ভূরাজনৈতিক অবস্থান তুরস্ককে অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব দেয়, যার কারণে তারা তাদের সাবমেরিন বহরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
গ্রিসের ১০টি সাবমেরিনও মূলত ভূমধ্যসাগরে কৌশলগত তৎপরতার জন্য ব্যবহৃত হয়। তুরস্কের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ এই সাবমেরিন প্রতিযোগিতাকে আরও উস্কে দেয়।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য, দু’টি পরমাণু শক্তিধর দেশের হাতেই রয়েছে ৯টি করে সাবমেরিন। এই সাবমেরিনগুলো মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও সম্পূর্ণভাবে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। তারা কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও এসব সাবমেরিন ব্যবহার করে।
ভিয়েতনামের কাছে রয়েছে ৯টি সাবমেরিন, যেগুলোর বেশিরভাগই রাশিয়া থেকে কেনা ‘Kilo-class’ সাবমেরিন। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত পানিসীমায় চীনের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে ভিয়েতনামও সাবমেরিন বাহিনীকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
মিশরের ৮টি সাবমেরিন মূলত রেড সি এবং ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন থাকে। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে মিশর এই দিক থেকে অনেক এগিয়ে।
তালিকার শেষদিকে রয়েছে ইতালি, যাদের হাতে রয়েছে ৮টি সাবমেরিন। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সজ্জিত ইতালির সাবমেরিনগুলো ইউরোপিয়ান নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে।
এই তালিকাটি শুধুমাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে প্রস্তুত হলেও, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ একেকটি সাবমেরিনের ক্ষমতা, প্রযুক্তি, কর্মক্ষমতা ও মিশন ভিন্ন। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কিছু সাবমেরিন এমন পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে, যা একসঙ্গে কয়েকটি শহর ধ্বংস করতে পারে। আবার কিছু দেশ কেবলমাত্র আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার জন্য সাবমেরিন ব্যবহার করে থাকে।
বর্তমানে যখন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর, ভূমধ্যসাগর ও আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, তখন সাবমেরিনের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এগুলো কেবলমাত্র সমুদ্রের নিচে যুদ্ধের প্রতীক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার এক নিঃশব্দ ভাষা।
পরিশেষে বলা যায়, গভীর সমুদ্রের এই নীরব শিকারিরা এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রগুলোর সাবমেরিন বহর শুধু সামরিক ব্যালান্সই নির্দেশ করে না, বরং ভবিষ্যতের কৌশলগত মুখোমুখি অবস্থানের ছায়াও তুলে ধরে।