
টানা আট দিনের ভয়াবহ বন্যার পর কক্সবাজারে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সড়ক, সেতু, বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।
জানা গেছে, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি বন্যাকবলিত হয়। এতে প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনো খাবারসহ ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বন্যার পানি কমলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক টিউবওয়েল পানির নিচে থাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুর্গম কয়েকটি এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। ইতোমধ্যে ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু এবং প্রায় ৯৮ হাজার হাঁস-মুরগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় জেলার ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতকাজ শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।