ঢাকাবুধবার , ১৫ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য
  3. লাইফস্টাইল

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৯ বিকাল

Link Copied!

বিপ্লব হোসাইন: পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা বদহজম ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু এসব সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে বারবার ফিরে আসে, তাহলে তা হতে পারে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (Irritable Bowel Syndrome-IBS) বা আইবিএসের লক্ষণ। চিকিৎসকদের মতে, এটি পরিপাকতন্ত্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্যগত (Functional) রোগ। এতে অন্ত্রে দৃশ্যমান কোনো ক্ষত বা গাঠনিক পরিবর্তন না থাকলেও রোগীর দৈনন্দিন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আইবিএসের মূল কারণ হলো মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে স্নায়বিক যোগাযোগ বা গাট-ব্রেন এক্সিস (Gut-Brain Axis)-এর ভারসাম্যহীনতা। রোগটি প্রাণঘাতী না হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির কারণে এটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে আইবিএস

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ থেকে ১১ শতাংশ মানুষ আইবিএসে আক্রান্ত। নারীদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে ৫০ বছরের কম বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রকোপ বেশি হওয়ায় এটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভৌগোলিকভাবে উন্নত পশ্চিমা দেশ ও দক্ষিণ আমেরিকায় আইবিএসের হার সবচেয়ে বেশি, যেখানে কিছু এলাকায় আক্রান্তের হার ২০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে এই হার কম হলেও ধীরে ধীরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশেও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা

বাংলাদেশেও আইবিএসকে দীর্ঘদিন সাধারণ পেটের সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসকরা এটিকে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এবং বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির (বিজিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ আইবিএসে আক্রান্ত।

গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে এ রোগের প্রকোপ বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে প্রায় ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং গ্রামে প্রায় ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ মানুষ আইবিএসে ভুগছেন। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরতা এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় IBS-M (Mixed Type), যেখানে রোগীরা পর্যায়ক্রমে ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। তবে সচেতনতার অভাবে আক্রান্তদের মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অধিকাংশ মানুষ ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

আইবিএসের ধরন

চিকিৎসাবিজ্ঞানে আইবিএসকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়—

IBS-D: ডায়রিয়া প্রধান।
IBS-C: কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান।
IBS-M: ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য পর্যায়ক্রমে দেখা দেয়।
IBS-U: উপসর্গ থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিতে পড়ে না।
কী কী সমস্যা দেখা দেয়

আইবিএসের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন তলপেটে ব্যথা বা মোচড়, পেট ফাঁপা, অতিরিক্ত গ্যাস, মলত্যাগের পরও অসম্পূর্ণতার অনুভূতি, বারবার পাতলা পায়খানা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য।

অনেক রোগী খাবার খাওয়ার পর পেটব্যথা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। ফলে তারা নিজেরাই অনেক ধরনের পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে শুরু করেন। এতে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি, রক্তশূন্যতা এবং দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বড় প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইবিএস কেবল অন্ত্রের রোগ নয়; এটি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, আইবিএস আক্রান্তদের মধ্যে উদ্বেগ (Anxiety) ও বিষণ্নতা (Depression) সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

হঠাৎ পেটে ব্যথা শুরু হওয়া কিংবা জরুরি ভিত্তিতে বাথরুমের প্রয়োজন হতে পারে—এমন আশঙ্কা রোগীদের সবসময় মানসিক চাপে রাখে। ফলে অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠান, অফিসের মিটিং, দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা বাইরে খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলেন।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

চিকিৎসকদের মতে, আইবিএস রোগীদের সামাজিক জীবনও অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা অনেক সময় পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সময় কাটাতে পারেন না। এতে একাকীত্ব ও মানসিক অবসাদ আরও বাড়ে।

অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে বারবার অনুপস্থিতি, মনোযোগের ঘাটতি এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিও হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও প্রোবায়োটিক গ্রহণের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইবিএস পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লো-ফডম্যাপ (Low FODMAP) খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ, ব্যক্তিভেদে সমস্যা সৃষ্টি করে এমন খাবার এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম এবং প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এছাড়া মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন কিংবা প্রয়োজন হলে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা থাকলে নিজে নিজে ওষুধ সেবন না করে দ্রুত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসাই আইবিএসের কারণে হওয়া শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তথ্যসূত্র: Rome IV Criteria, The Lancet, বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটি (BGS), BSMMU জার্নাল এবং আমেরিকান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (AGA) গাইডলাইনস।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা

তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন ২০০ মিটার বাঁধ, পানিবন্দি প্রায় হাজার পরিবার

কক্সবাজারে বন্যার পানি নামছে, সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

পাঁচ অঞ্চলে দুপুরের মধ্যে ঝড়ের সতর্কতা

হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, একদিনে আক্রান্ত ৯৯০

দেশে ৭১ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক রোগে

Over 1,000 BYD Vehicles Now on the Roads of Bangladesh

দেশের রাস্তায় এখন ১ হাজারেরও বেশি বিওয়াইডি গাড়ি

OPPO Is Making Football Fans’ Dream of Meeting Jamal Bhuyan Come True

জামাল ভূঁইয়ার সাথে ফুটবলপ্রেমীদের দেখা করার স্বপ্ন সত্যি করছে অপো