ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

আধুনিক সম্পর্কের সংকট: বৈবাহিক প্রতারণা, বিলম্বিত বিবাহ ও ডেটিং সংস্কৃতির উত্থান

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২১ জুলাই ২০২৫, ২:০৪ বিকাল

Link Copied!

বৈশ্বিক সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও বৈবাহিক সম্পর্কের গঠন ও চরিত্রও ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিয়ের সংজ্ঞা এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ধারণা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের মুখে। সমাজে দ্রুত পরিবর্তনশীল মূল্যবোধ, প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অগ্রাধিকার—সব মিলিয়ে আজকের দিনে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গভীর উত্তেজনাপূর্ণ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা, জরিপ এবং পরিসংখ্যান এসব পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক দেশেই বিবাহিত পুরুষদের বড় একটি অংশ স্বীকার করেছেন যে তারা বৈবাহিক জীবনে প্রতারণা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ডে ৫৬ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ প্রতারণায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপরেই রয়েছে ডেনমার্ক (৪৬%), ইতালি (৪৫%), ফ্রান্স (৪৩%) ও জার্মানি (৪০%)। এই দেশগুলোতে প্রতারণা যেন একটি সাংস্কৃতিক গঠনপ্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে বলেই ধারণা করা হয়। ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো দেশেও এই হার ৩৫ শতাংশের ওপরে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব দেশেই পুরুষদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স তুলনামূলকভাবে বেশি। যেমন, স্পেনে গড় বয়স ৪০.৮ বছর, নেদারল্যান্ডসে ৩৯.২ বছর, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৯ বছর, আর্জেন্টিনায় ৩৮.৮ বছর এবং নরওয়েতে ৩৮.৪ বছর। এমন বিলম্বিত বিবাহ প্রবণতা কিছুটা হলেও ইঙ্গিত করে যে সম্পর্কের প্রতিশ্রুতিকে দীর্ঘায়িত করার পূর্বেই বহু পুরুষ বিভিন্ন সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করছেন এবং এক ধরনের স্থায়ী বন্ধন এড়িয়ে চলছেন।

এই প্রবণতার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করছে প্রযুক্তির বিকাশ এবং অনলাইন ডেটিং সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৪৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো না কোনো ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন। কানাডায় এই হার ৩৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বেলজিয়াম (২৮%), লুক্সেমবার্গ (২৭%), যুক্তরাজ্য (২৫%) এবং ফ্রান্স (২৪%) ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রয়েছে।

এই ডেটিং অ্যাপগুলোর সহজলভ্যতা, গোপনীয়তা এবং বিকল্প সম্পর্কের আকর্ষণ অনেক বিবাহিত পুরুষকেও এসব অ্যাপ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে বলে মনোবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন। তবে শুধু অ্যাপ নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও এই প্রবণতার পেছনে দায়ী। যেমন, ইউরোপের কিছু দেশে একাধিক সম্পর্ক বা “ওপেন ম্যারেজ” ধারণা অনেক বেশি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

সামাজিক গবেষকরা মনে করেন, এই বৈবাহিক প্রতারণার একটি অন্যতম কারণ হলো বিয়েকে ঘিরে থাকা ঐতিহ্যবাহী মানসিক কাঠামোর ভাঙন। আগে যেখানে বিয়ে ছিল আত্মত্যাগ ও সহিষ্ণুতার সম্পর্ক, এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক সুবিধা ও মানসিক সন্তুষ্টির ভারসাম্যের ওপর দাঁড়ানো একটি চুক্তি। এই মানসিকতার পরিবর্তন নতুন প্রজন্মকে আরও স্বতন্ত্র হতে শিখিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্ববোধও হ্রাস পেয়েছে।

তবে বৈবাহিক জীবনে প্রতারণার হার শুধু পশ্চিমা বিশ্বেই বেশি এমনটা নয়। ভারতেও প্রায় ২৫ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার ২৩ শতাংশ এবং চীনে ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে এমন বিষয়ে প্রকাশ্য জরিপ খুব কম হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবে এখানে থেকেও ব্যতিক্রম নয়।

অন্যদিকে, প্রথম বিবাহের গড় বয়সে ভারতের স্থান অনেকটা মধ্যমে। ভারতীয় পুরুষরা গড়ে ৩০ বছর বয়সে বিয়ে করেন, যা ইউরোপীয় মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে কম হলেও পূর্ব এশিয়ার তুলনায় বেশি। এই বয়সে পৌঁছানোর পূর্বেই অনেক পুরুষ প্রেম ও সম্পর্কের নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যান, যা বৈবাহিক জীবনের পরে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। একই সময়ে, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের দিক থেকে ভারত বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রায় ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এই অ্যাপ ব্যবহার করছেন।

ডেটিং অ্যাপের সঙ্গে প্রতারণার সম্পর্কের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেন, এগুলো মানুষকে বেছে নিতে সাহায্য করে এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। অন্যদিকে কেউ বলেন, এসব অ্যাপ সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা কমিয়ে দেয়, মানুষকে ‘পর্যায়ের পর পর্যায়’ সম্পর্কের দিকে ধাবিত করে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা সৃষ্টি করে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখা যায়—প্রযুক্তি, সমাজ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে কেন্দ্র করে গঠিত নতুন সামাজিক কাঠামো এখন ‘এক জীবন, এক সঙ্গী’ নীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দাম্পত্য সম্পর্ক কেবল যৌথ বসবাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানসিক পরিতৃপ্তি, পারস্পরিক সম্মান এবং বিশ্বাসের জটিল এক নকশা হয়ে উঠেছে। এই নকশায় যখনই ফাটল ধরে, তখনই তার সুযোগ নেয় বহিরাগত বিকল্প—হোক সেটা অন্য কোনো সম্পর্ক, কিংবা একটি ডেটিং অ্যাপ।

বৈবাহিক প্রতারণা, বিলম্বিত বিবাহ এবং ডেটিং সংস্কৃতির এই ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরছে—আমরা কি সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে দায়িত্বের চেয়ে চাহিদা, নিষ্ঠার চেয়ে বিকল্প এবং স্থায়িত্বের চেয়ে সাময়িকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামাজিক, নৈতিক এবং মানসিক কাঠামোর পুনর্বিবেচনা ছাড়া সম্ভব নয়। বৈবাহিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য আমাদের নিজেদের সমাজে, মূল্যবোধে ও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। নতুবা সম্পর্কের এই সংকট আরও গভীর ও জটিলতর হবে, যার প্রতিফলন শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, পুরো সমাজব্যবস্থায় পড়বে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস