ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ সকাল

Link Copied!

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রকল্পটির দৃশ্যমান কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করতে পারেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।

সোমবার (২ নভেম্বর) পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অগ্রগতি ও সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানান।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পানি ভবনে এ প্রকল্পের জন্য আলাদা অফিসও করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি আরও গতিশীল হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী এর দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।

তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভবিষ্যতে বসবাসের পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলের মানুষ নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখবেন এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে সরকার। এর পুরো অর্থায়ন করা হবে সরকারি তহবিল থেকে। প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট দূর করাই এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য। বর্ষাকালে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।

প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। এতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট বা স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ।

ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট ও লবণাক্ততা কমানোর লক্ষ্য

একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো ছিল প্রাণবন্ত। তবে ১৯৭০-এর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের পদ্মা নদীর প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীর নাব্যতা কমে যায় এবং লবণাক্ততা বাড়তে থাকে।

বর্তমানে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ বিভিন্ন নদী পানিপ্রবাহের সংকটে রয়েছে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ও পলি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির অভাবে কৃষি, মৎস্য উৎপাদন, নৌ চলাচল ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।

বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক দূষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমছে এবং অনেক জেলে জীবিকা হারাচ্ছেন। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

১৯ জেলায় সেচ সুবিধা, বাড়বে মাছের উৎপাদন

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহে সহায়তা করা হবে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়বে।

প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়বে। সব মিলিয়ে বছরে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কী ভূমিকা রাখবে?

প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানো এবং সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া যশোরের ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। গত দুই দশকে নদীভাঙনে পদ্মা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতীরবর্তী জেলাগুলোতে প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।

প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবন ও আশপাশের পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতাও বাড়বে।

তিনি বলেন, এসব সমস্যা মোকাবিলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির সরবরাহ ও প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে এবং পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদীর ক্ষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

পদ্মা ব্যারাজের উদ্যোগের ইতিহাস

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগের ইতিহাস তুলে ধরে সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী এবং পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নৌ চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও অর্থনীতিতে। এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পদ্মা ব্যারাজের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথম নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে আবারও উদ্যোগ নেন। তবে তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সামনে এনে পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, অদূর ভবিষ্যতে পদ্মা ব্যারাজ দৃশ্যমান হবে এবং দেশের মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে।

এদিকে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসুত্র: বাসস

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা