
একটি দেশের সীমান্ত শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়—এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের এক স্পর্শকাতর রেখা। আর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত যেন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে রক্তাক্ত স্মৃতির প্রাচীর। বিগত ১১ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে ৩৫৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন—কারও কারও মৃত্যু হয়েছে গুলিতে, কেউ প্রাণ হারিয়েছেন নির্মম নির্যাতনে। শুধু মৃত্যু নয়, বিএসএফের হাতে এই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ৪০৬ জন, আর অপহরণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৩২৪ জন মানুষ। এসবই ঘটেছে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ১১ বছরে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ২০২০। সে বছর বিএসএফের হাতে নিহত হন ৪৫ জন বাংলাদেশি, যার মধ্যে ৩৯ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং ৬ জন নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারান। একই বছর আহত হন ২৬ জন এবং অপহরণের শিকার হন ২২ জন। আর ২০২৩ সালেও একইভাবে ৪৮ জন নিহত হন, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর বাইরে ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও বিএসএফের হাতে অনেক বাংলাদেশি প্রাণ হারান।
২০২৩ সালে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৮ জন, যাদের মধ্যে ৩৮ জন গুলিতে ও ১০ জন নির্যাতনে মারা যান। এ সময় আহত হন ৩১ জন। এটি একটি উদ্বেগজনক দিক, কারণ এই সময়েই বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক তথাকথিতভাবে ‘উষ্ণ’ ও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বলে প্রচারিত হচ্ছিল।
আরও ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, প্রতিটি বছরেই অপহরণের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশিরা। অপহরণ একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যা শুধু ব্যক্তি নয়—পরিবার ও সামগ্রিক সীমান্ত জনপদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ২০১৪ সালে বিএসএফের হাতে অপহরণের শিকার হন ১১০ জন, ২০১৫ সালে ৫৯ জন, ২০১৮ সালে ৬৩ জন এবং ২০১৯ সালে ৩৪ জন। সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ কিছুটা কমেছে বটে, কিন্তু ২০২৪ সালের প্রথম চার মাসেই ৫ জন অপহরণ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠে আসে—বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা কী? একদিকে উভয় দেশের মধ্যে বিজিবি-বিএসএফের নিয়মিত পতাকা বৈঠক হয়, কূটনৈতিক যোগাযোগ চলে, উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর অনুষ্ঠিত হয়; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের রক্তে ভিজে থাকে সীমান্তের মাটি। তিস্তা চুক্তির মত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে অনাগ্রহী অবস্থান নিলেও বাংলাদেশ বারবার ট্রানজিট, বিদ্যুৎ আমদানি, সড়কপথ সুবিধা ইত্যাদি দিয়ে ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করে যাচ্ছে। তবুও বিএসএফের হাতে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে গরু পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার অন্যতম। কিন্তু এসব অপরাধের বিচার হওয়া উচিত আইনের মাধ্যমে, সীমান্তেই গুলি করে হত্যা নয়। ভারতীয় সংবিধান বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কোনোটিই সীমান্তে এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না।
এই প্রসঙ্গে অনেক সময় ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএসএফ আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালায়। কিন্তু এই বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ অনেক সময় নিরস্ত্র কৃষক, শিশু বা সাধারণ মানুষও এই গুলির শিকার হন। বিশেষ করে রাতে বা ফজরের সময় সীমান্ত এলাকায় যেসব ‘তথাকথিত সন্দেহভাজন’ মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়, তাদের অনেকের সুনির্দিষ্ট পরিচয়ই পাওয়া যায় না। দাফনের দায়িত্ব নিতে হয় বাংলাদেশ সীমান্তবাসীকে।
২০২১ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সে বছর বিএসএফের হাতে প্রাণ হারান ১৮ জন। যদিও এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ওই সময় ভারতে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্তে ‘রেসট্রেইন্ট পলিসি’ অনুসরণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই নীতির কোনো প্রভাব মাটিতে দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতি কেবল মৃত্যু আর হাহাকারেই সীমাবদ্ধ নয়—এর গভীর প্রভাব রয়েছে সীমান্ত এলাকার সমাজ, অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্বেও। এসব অঞ্চলের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, চাষাবাদ করতে ভয় পায়, সন্তানদের রাতে বাইরে পাঠাতে সাহস পায় না। সীমান্তে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দিনমজুর বা কৃষিকাজে নিয়োজিত। তারা জীবিকার জন্য সীমান্তঘেঁষা এলাকায় চলাচল করতে বাধ্য হয়, কিন্তু যেকোনো সময় হতে পারে হত্যার শিকার।
বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানায়, দাবি তোলে তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির। কিন্তু এই দীর্ঘ ১১ বছরে কয়টি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে, কয়টি ঘটনার বিচার হয়েছে, কিংবা আদৌ ভারত কোনোবার দুঃখপ্রকাশ করেছে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো জবাবহীন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তে নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়া শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিক ব্যর্থতাও। দুই দেশের সম্পর্ক যতই ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ বলা হোক না কেন, একদিকে রক্ত আর অন্যদিকে মৈত্রীর কথা একসাথে চলতে পারে না।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের জীবনরক্ষা করা সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব। তাই সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর অবসান ঘটানো শুধু একটি কূটনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একেবারে জাতীয় মর্যাদার বিষয়। এখন সময় এসেছে—সীমান্তে রক্তপাত বন্ধের দাবিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার।