ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ পাসের দাবি

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৪ এপ্রিল ২০২৬, ২:৪২ বিকাল

Link Copied!

বাংলাদেশে তামাকের ভয়াবহ ছোবল থেকে জনস্বাস্থ্য এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে এটি স্থায়ী আইন হিসেবে পাস না হলে বাতিল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যা দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র
টোব্যাকো অ্যাটলাস (২০২৫)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত কারণে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। বর্তমানে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য—২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা, অথচ এর বিপরীতে তামাকজনিত মৃত্যু, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, তামাক নিয়ন্ত্রণের ফলে সরকার রাজস্ব হারাবে—তামাক কোম্পানিগুলোর এমন দাবিকে নিছক অপপ্রচার বলে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাদেশ ২০২৫: যা থাকছে নতুন সংশোধনীতে
২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (WHO FCTC)-এ স্বাক্ষর এবং ২০০৫ সালে প্রণীত মূল আইনকে যুগোপযোগী করতেই এই নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs)-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই অধ্যাদেশে বেশ কিছু কঠোর ও যুগান্তকারী বিধান যুক্ত করা হয়েছে:

ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: ‘হার্ম রিডাকশন’-এর নামে তরুণ সমাজকে নেশাগ্রস্ত করতে বাজারজাত করা ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পাবলিক প্লেসে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ: সকল পাবলিক প্লেস এবং যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পূর্বের আইনের ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা’ (DSA) রাখার বিধানটি বাতিল করা হয়েছে।

সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধি: তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ: বিক্রয়স্থলে তামাকপণ্যের প্রদর্শন এবং ডিজিটাল মিডিয়া, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের মাধ্যমে এর বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে নিষেধাজ্ঞা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও খেলাধুলার স্থানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যেসব প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত হয়নি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নতুন অধ্যাদেশটিকে স্বাগত জানালেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা চূড়ান্ত পর্যায়ে বাদ পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—খোলা বা খুচরা তামাকপণ্য বিক্রি নিষিদ্ধকরণ, ভ্রাম্যমাণ ও ফেরী করে বিক্রি বন্ধ করা, বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং তামাক কোম্পানিগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি (CSR) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব। এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আইনে রূপান্তরের আবশ্যকতা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, তামাক যেহেতু মাদকাসক্তির প্রবেশদ্বার, তাই অধ্যাদেশটি অবিলম্বে আইনে রূপান্তরিত না হলে লক্ষ লক্ষ তরুণ মাদকের ঝুঁকির মুখে পড়বে। জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে এই অধ্যাদেশটিকে স্থায়ী আইন হিসেবে পাস করা এখন সময়ের দাবি। এটি পাস হলে শুধু অকালমৃত্যুই হ্রাস পাবে না, বরং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এর ব্যর্থতায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে এবং অসংক্রামক রোগের বিস্তার রুখতে এই অধ্যাদেশটি স্থায়ী আইনে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। তামাক কোম্পানিগুলোর অপপ্রচার ও ব্যবসায়িক চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিলে আগামী প্রজন্মকে একটি তামাকমুক্ত সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা