ঢাকামঙ্গলবার , ২১ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূমিধসে নিহত ১৭, বাস্তুচ্যুত ৩ হাজার

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ বিকাল

Link Copied!

চলতি জুলাইয়ে ভয়াবহ ভূমিধসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এক গভীর মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ১৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত হয়েছেন এবং ৩ হাজার-এর বেশি মানুষ তাদের আশ্রয়স্থল হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার বহনকারী এই ক্যাম্পগুলোতে এখন পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

দুর্যোগের চিত্র:
ক্যাম্পের পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা ‘রোহিঙ্গা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে দুর্যোগ-সংক্রান্ত ২৮৬টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যা সরাসরি ২৬ হাজার ১১৯ জন শরণার্থীকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই দুর্যোগে ৪ হাজার ৩০৭ জন মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৩টি ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল ঘরবাড়িই নয়, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে থাকা লার্নিং সেন্টার, শৌচাগার, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ঢালু পথ, সিঁড়ি, সেতু ও রাস্তাঘাট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ক্যাম্পের সাধারণ জীবনযাত্রাকে অচল করে দিয়েছে।

পাহাড় ও বন উজাড়ের সংকট:
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও নকশা নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল। ক্যাম্পগুলো মূলত খাড়া পাহাড়ের ঢাল কেটে তৈরি করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে কথা বলা একজন পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জানান, শরণার্থী আসার শুরুর দিকেই বন উজাড় করে এবং অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়াই এই ক্যাম্পগুলো তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি এই ত্রুটিপূর্ণ নকশাকেই দায়ী করেছেন। পাহাড়ের ঢালগুলো এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যা প্রতি বর্ষায় মৃত্যুফাঁদ তৈরি করছে।

বাড়ছে নতুন শরণার্থীর ঝুঁকি:
মায়ানমারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘাতের ফলে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে কক্সবাজারে নতুন করে অন্তত ১ লাখ ৫২ হাজার শরণার্থী প্রবেশ করেছেন। নতুন আসা এসব শরণার্থীদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আবাসন বরাদ্দ না থাকায়, তারা ক্যাম্পের ভেতরেই অনিরাপদ জায়গায় ঘর ভাড়া নিতে বা তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক অসহায় পিতা জানান, তিনি বারবার এনজিও কর্মীদের কাছে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তাকে বলা হয় নতুন আগতদের জন্য কোনো শেল্টার বরাদ্দ নেই। এর ফলে তিনি পাহাড়ের কিনারে একটি অস্থায়ী ঘর তৈরি করতে বাধ্য হন। গত ৬ জুলাই ভূমিধসের ঘটনায় তার দুই মেয়ে ও দুই নাতি প্রাণ হারান। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না পাহাড় এভাবে ধসে পড়বে।’

ত্রাণ ও তহবিল সংকটের প্রভাব:
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ তহবিলের প্রয়োজন, তা বর্তমানে তীব্র সংকটের মুখে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘প্রতিটি বর্ষাকাল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে’। তার মতে, এগুলো শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং শরণার্থীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া নীতিগুলোর একটি অনিবার্য পরিণতি।

বর্তমানে ‘শেল্টার অ্যান্ড ক্যাম্প কোঅর্ডিনেশন অ্যান্ড ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট’-এর জন্য প্রয়োজনীয় আবেদনের মাত্র ৪২ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এখনও ৮৮৬.৮ কোটি টাকা (৭৩.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ক্ষেত্রেও ২৭৮.৪ কোটি টাকা (২৩.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি ও জটিলতা:
বাংলাদেশ সরকার নতুন শরণার্থীদের জন্য অতিরিক্ত জমির ব্যাপারে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর অনুরোধ এখনো বিবেচনায় রাখেনি। মানবিক সহায়তা কর্মীদের মতে, বাংলাদেশ সরকার চায় না শরণার্থীরা এখানে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বসবাস করুক, তাই নতুন কোনো আশ্রয়কেন্দ্র বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে গত ডিসেম্বরে সরকার বাঁশের তৈরি কাঠামোর চেয়ে শক্তিশালী অস্থায়ী শেল্টার নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। এছাড়া দুই তলা বিশিষ্ট শেল্টার তৈরির পাইলট প্রজেক্ট এবং ৫০ হাজার শেল্টার পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু জানুয়ারি ২০২৫-এ মানবিক সহায়তা তহবিল কমে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনাগুলো মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও স্থায়ী বসতি স্থাপনের আশঙ্কায় এসব পরিকল্পনায় আপত্তি জানানো হয়েছে।

করণীয় ও মানবিক দায়বদ্ধতা:
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, আশ্রয়স্থলের নিরাপত্তাকে স্থায়ী বসতি স্থাপনের চেয়ে বড় করে দেখা উচিত—এটি মূলত একটি মানবাধিকারের বিষয়। অবিলম্বে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীলকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর নিশ্চিত করতে তহবিল জোগান দেওয়া প্রয়োজন। মীনাক্ষী গাঙ্গুলী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, আর কতটি পরিবারের প্রাণ গেলে তারা জেগে উঠবে—সে অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়।’

বর্ষাকাল সাধারণত অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে আরও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়াতে হলে দাতা দেশ, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শরণার্থী ক্যাম্পের ভেতরে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সংশ্লিষ্টদের।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে তিস্তার ভাঙন, পানিবন্দি ১০ হাজার মানুষ

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের নির্দেশ প্রতিমন্ত্রীর

হাজারে ১ টাকাই থাকছে বীমা কোম্পানির ২০২৬ সালের নবায়ন ফি

মরিচের ঝাল এখন বাজারেও, রাজধানীতে কেজি ২৮০ টাকা

মানিকগঞ্জে ট্রাক-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১

কাঁচাবাজারে আগুন! ১০০ টাকার নিচে মিলছে না অনেক সবজি

আগামী ৫ দিন যেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া

সন্ধ্যার মধ্যে ৬ অঞ্চলে ঝড়ের আশঙ্কা

টানা বৃষ্টিতে যশোরে গ্রামীণ সেতু ধস, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৫তম

দুই দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?