ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

রেকর্ড সহিংসতার মুখেও জীবন বাঁচাতে লড়ছে স্থানীয় ত্রাণকর্মীরা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২২ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ সকাল

Link Copied!

বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট, যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। লাখ লাখ মানুষ যখন ক্ষুধা, মহামারী, গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়াতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন মানবিক কর্মীরা। অথচ এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আর্তমানবতার সেবায় যাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রাখেন, সেই ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা আজ বিশ্বজুড়ে চরম হুমকির মুখে।

প্রতি বছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব মানবিক দিবস’ পালিদ হয়। ২০০৩ সালের এই দিনে ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক ভয়াবহ বোমা হামলায় মিশন প্রধানসহ ২২ জন মানবিক কর্মী নিহত হন। তাদের সেই আত্মত্যাগের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার সঙ্গে জড়িতদের প্রতি সম্মান জানাতে দিনটি পালন করা হয়।

তবে এবারের বিশ্ব মানবিক দিবসের আবহটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগের। দিবসটির প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক দাতা ও সাহায্যকারী সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়ংকর চিত্র। এতে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ও দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বিগত সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

চরম সহিংসতার শিকার স্থানীয় ও জাতীয় কর্মীরা:
প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরের (২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত) একটি বিশদ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিক সংঘাতে মানবিক কর্মীদের ওপর চালানো সহিংসতার সিংহভাগই পোহাতে হয় স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের কর্মীদের। গত পাঁচ বছরে যত মানবিক কর্মী হামলা, হত্যা, আটক কিংবা অপহরণের শিকার হয়েছেন, তার প্রায় ৯৬ শতাংশই ছিলেন স্থানীয় কর্মী।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পাঁচ বছরে প্রায় ৩ হাজার ৪৯৬ জন জাতীয় ত্রাণকর্মী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক বা বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩৪ জন। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর বড় বড় বিদেশি কর্মকর্তারা সাধারণত কড়া নিরাপত্তা বলয় ও বাঙ্কারে সুরক্ষিত থাকেন। কিন্তু স্থানীয় কর্মীরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করেন। ফলে সংঘাতের সম্মুখসারিতে থাকা এই মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন।

অথচ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনীতিতে এক ধরণের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদেশি কোনো কর্মীর ওপর সামান্য আঘাত এলে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের আলোচনা হয়। কিন্তু স্থানীয় কর্মীরা প্রতিদিন শত শত মানুষের জীবন রক্ষার তাগিদে যুদ্ধক্ষেত্র বা দুর্গম এলাকায় প্রাণ হারালেও তা প্রায়শই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে না বা বিশ্ববাসীর নজরের আড়ালেই থেকে যায়।

রেকর্ড ভাঙা রক্তক্ষয়ী বছর ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি:
প্রতিবেদনটিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলো মানবিক কর্মীদের জন্য ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শুধুমাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ১৮০ জনের বেশি ত্রাণকর্মী গুরুতর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলসহ বিশ্বের অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্থিতিশীল অঞ্চলে সংঘাতের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করায় সেখানে কর্মরত মানবিক কর্মীদের প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ, ত্রাণবাহী গাড়িবহরে বাধা প্রদান, গুদাম লুট এবং সাহায্যপ্রার্থীদের লাইনে হামলার মতো মর্মান্তিক ঘটনা এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের প্রতি চরম অবহেলা ও লঙ্ঘন। বর্তমান বিশ্বে সংঘাতের নিয়মকানুন ও নৈতিকতা প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে। যুদ্ধরত বিভিন্ন পক্ষ (মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো) ত্রাণবাহী কর্মী, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সকে নিরপেক্ষ সত্ত্বা হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে তাদেরও প্রতিপক্ষ বা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধের শামিল।

স্থানীয় কর্মীদের অবদান ও কাঠামোগত দুর্বলতা:
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বড় বড় তহবিল, নীতিমালা ও দূরবর্তী নির্দেশনা বাদ দিলে মাঠপর্যায়ে স্থানীয় ত্রাণকর্মীরাই মূলত প্রকৃত মানবিক যোদ্ধা। তারা নিজেদের কমিউনিটি, সমাজ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, সংকট ও মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝেন। খাদ্য সংকট, মহামারী, আকস্মিক বন্যা, ভূমিকম্প কিংবা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ—যেকোনো দুর্বিপাকে সবার আগে এই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, যাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য মানুষের জীবন রক্ষা করার মহান দায়িত্ব রয়েছে, আজ তাদের নিজেদের জীবন রক্ষাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্থানীয় এই স্বেচ্ছাসেবক বা কর্মীরা পর্যাপ্ত জীবন বীমা, উন্নত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ছাড়াই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছেন। বড় সংস্থাগুলো অনেক সময় আন্তর্জাতিক কর্মীদের জন্য কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি গৌণ হিসেবে থেকে যায়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য:
মানবিক কর্মীদের ওপর এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও আইনি সুরক্ষার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক ও জাতিসংঘ কর্মীদের ওপর যত হামলা হয়, তার ৯০ শতাংশেরই শিকার হন জাতীয় বা স্থানীয় কর্মীরা। স্থানীয় সহকর্মীরাই মূলত সরাসরি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকেন এবং সেবাপ্রদানকারী কমিউনিটির কাছাকাছি থাকার কারণে তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। সংস্থা হিসেবে আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সকল কর্মী ও অংশীদারদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবে এই দায়িত্ব কেবল মানবিক সংস্থাগুলোর একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়; ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সরকার এবং সংঘাতের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোর।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রয়েছে, কিন্তু সমস্যাটি হলো জবাবদিহিতার অভাব। অপরাধীদের বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বে মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা কেবল নীতিবহির্ভূতই নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান ও সুপারিশ:
বিশ্ব মানবিক দিবসের এই গম্ভীর প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো জাতিসংঘ, বিশ্বনেতৃবৃন্দ এবং সংঘাতের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের প্রতি কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধে কেবল মৌখিক নিন্দা বা বিবৃতি দিয়ে দায় সারলে চলবে না; বরং যুদ্ধরত পক্ষগুলোর ওপর কার্যকর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

প্রতিবেদনে মানবিক সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। যেমন-

নিরাপত্তার সমতা নিশ্চিতকরণ: আন্তর্জাতিক কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় ত্রাণকর্মীদেরও সমকক্ষ নিরাপত্তা সুবিধা, ঝুঁকি ভাতা ও উন্নত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: মানবিক কর্মীদের ওপর হামলাকারী অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মানবিক করিডোর রক্ষা: সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের পথ বা করিডোরগুলো সবসময় নিরাপদ রাখতে হবে, যাতে সাহায্য পৌঁছানোর কারণে কোনো কর্মীকে জীবন হারাতে না হয়।

সরকার ও দাতা সংস্থার দায়বদ্ধতা: স্থানীয় সংস্থাগুলোকে পর্যাপ্ত আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দিতে হবে যাতে তারা মাঠপর্যায়ে আরও সুসংগঠিতভাবে কাজ করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবিক কর্মীরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র বা যুদ্ধের কোনো পক্ষের অংশ নয়; তাদের একমাত্র পরিচয় তারা মানুষ এবং তারা সেবাপ্রদানকারী। যুদ্ধ, হিংসা, ক্ষুধা ও দুর্যোগের অন্ধকারের মধ্যেও যারা মানবতা ও আশার প্রদীপ জ্বেলে রাখেন, সেই ত্রাণকর্মীদের রক্ত, ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে গড়া মানবিক মূল্যবোধ আজ গভীর সংকটের মুখে।

বিশ্ববাসীকে আর নীরব দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না; বরং এই নির্বিচার সহিংসতার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, যদি সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করা এই মানুষগুলোর সুরক্ষাই নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে মানবতা, সমবেদনা ও সহায়তার শেষ আলোটুকুও চিরতরে নিভে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হবে। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের কাজের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা