
বিশ্বের সামাজিক সম্পর্কের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের একটি বড় চালিকাশাঠি হয়ে উঠেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে থাকা একটি অ্যাপ—ডেটিং অ্যাপ। একসময়ে ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার জন্য মানুষের নির্ভরতা ছিল পারিবারিক পরিচয়, বন্ধুবান্ধব বা দৈনন্দিন সামাজিক মেলামেশার উপর। কিন্তু ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, ভালোবাসা, পরিচয় কিংবা স্বল্পস্থায়ী সম্পর্কের খোঁজ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে প্রযুক্তিনির্ভর এই প্ল্যাটফর্মগুলোর উপর।
সাম্প্রতিক একাধিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বেশ কিছু দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন। তবে এই হার সব দেশে সমান নয়। সমাজের মূল্যবোধ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, নাগরিকদের জীবনধারা এবং একক বসবাসের প্রবণতা এসব ব্যবহারের হারের উপর বড় প্রভাব ফেলছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যেখানে ৪৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করছেন। প্রযুক্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় অগ্রসর এই দেশটিতে প্রেম বা সম্পর্কে জড়ানো অনেকটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগের উপর নির্ভরশীল, যা এই উচ্চ হারের একটি বড় কারণ।
অস্ট্রেলিয়ার পরেই রয়েছে কানাডা, যেখানে ৩৫ শতাংশ নাগরিক ডেটিং অ্যাপে সক্রিয়। দেশটির অনেক শহরে একক জীবনযাপনকারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং এর পাশাপাশি প্রবাসী ও অভিবাসীদের সংখ্যাও বাড়ছে, যারা সামাজিক যোগাযোগের সহজ মাধ্যম হিসেবে অ্যাপকে বেছে নিচ্ছেন।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক প্রেম, সম্পর্ক কিংবা বন্ধুত্বের খোঁজে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন। এই দেশে Tinder, Bumble, Hinge সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় অ্যাপের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই বেশি, এবং বহু গবেষণায়ও এটি উঠে এসেছে যে প্রযুক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্রের রোমান্টিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে বেলজিয়াম ও লাক্সেমবার্গ। ইউরোপের এই দুটি ছোট দেশেই নাগরিকদের ডিজিটাল জীবনধারার প্রভাব অত্যন্ত প্রবল, এবং সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে তারা মুখ তুলে তাকান মোবাইল স্ক্রিনের দিকেই।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রবণতা হয়ে উঠেছে। এই দেশগুলোতে সামাজিক স্বাধীনতা ও একক জীবনের ব্যাপকতা ডেটিং অ্যাপের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোর ব্যবহারের হার কিছুটা কম হলেও, তা মোট জনসংখ্যার দৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য। ইউরোপীয় সমাজের একটি অংশ এখনো সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির চোখে দেখে, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মাঝে পরিবর্তন আসছে।
ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার বড় দেশগুলোতে ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও, তা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ভারতে ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক বর্তমানে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চীনে ৬ শতাংশ, জাপানে ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ এই ধরনের অ্যাপে সক্রিয়।
এই পার্থক্যকে বোঝার জন্য সমাজ সংস্কৃতি, পরিবার-কেন্দ্রিক মূল্যবোধ এবং প্রযুক্তির প্রতি গ্রহণযোগ্যতার দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশে সামাজিকভাবে প্রেম প্রকাশ বা অনলাইন মাধ্যমে সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা সংকোচ রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই হার আগামী দশকে আরও বাড়বে। করোনা মহামারির সময় যেভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সম্পর্ক স্থাপনের বিকল্প খোঁজা হয়েছে, তাতে অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
অন্যদিকে, উচ্চহারে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, অ্যাপে তৈরি সম্পর্কগুলোর গভীরতা কম, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি থাকে না এবং ব্যবহারকারীরা সহজেই একাধিক সম্পর্কে জড়াচ্ছেন।
তবে ডেটিং অ্যাপগুলোও এসব সমস্যার সমাধানে নানা রকম বৈশিষ্ট্য সংযোজন করছে—যেমন, ব্যক্তিত্বভিত্তিক ম্যাচিং, ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফিল্টার, কিংবা ভয়েস/ভিডিও কল ফিচার। ফলে ব্যবহারকারীদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আর কেবল ‘স্বরূপে আকৃষ্ট হওয়ার’ মাধ্যম নয়, বরং একে কেন্দ্র করেই অনেক সম্পর্ক শুরু হচ্ছে, গড়ে উঠছে দাম্পত্য জীবন।
বিশ্বায়নের এ যুগে, যেখানে একজন মানুষ কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের অপরিচিত কারো সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন একটি স্ক্রিন স্পর্শেই, সেখানে ডেটিং অ্যাপ শুধু প্রযুক্তি নয়, সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক।
পরিশেষে বলা যায়, ভালোবাসা, একাকীত্ব, কিংবা নিছক বন্ধুত্ব—সব কিছুর খোঁজেই মানুষ এখন নতুন ডিজিটাল পথের সন্ধানে। এবং এই যাত্রার প্রতীক হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনের একেকটি ছোট্ট আইকন—ডেটিং অ্যাপ। বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহারের হার, পার্থক্য, এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া আমাদের জানান দিচ্ছে এক নতুন যুগের সন্ধানের গল্প।