
ভোরের আলো ফুটছে না, কিন্তু আকাশ যেন তপ্ত ধোঁয়ার আস্তরণে ঢাকা। বিশ্ব যেন এক নতুন সূর্যোদয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু সেই সূর্য এখন আর পশ্চিমে ওঠে না, বরং পূর্ব দিগন্তে উদিত হচ্ছে। এ যেন শুধু আকাশের রঙের পরিবর্তন নয়, একটি অর্থনৈতিক যুগের সন্ধিক্ষণ। ২০৭৫ সালের পৃথিবী অর্থনীতির এক সম্পূর্ণ নতুন মানচিত্রে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেখানে প্রথাগত পশ্চিমা আধিপত্য পিছনে পড়ে যাবে এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি দৃঢ় গতিতে সামনে এগিয়ে আসবে।

২০২৩ সালের অর্থনৈতিক মানচিত্রে বিশ্ব শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, জাপান ও যুক্তরাজ্য। কিন্তু ২০৭৫ সালের পূর্বাভাস বলছে, বিশ্ব অর্থনীতির রূপান্তর হবে বিপ্লবাত্মক। গোল্ডম্যান স্যাকস–এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০৭৫ সালে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হবে চীন, যার মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) হবে প্রায় ৫৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরপরই থাকবে ভারত (৫২.৫ ট্রিলিয়ন) এবং যুক্তরাষ্ট্র (৫১.৫ ট্রিলিয়ন)।
এই তালিকা যে কোনো অর্থেই যুগান্তকারী। ২০৫০ সালে যেখানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ছিল সামান্য ব্যবধানে, সেখানে ২০৭৫ সালে ভারতের উত্থান হবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জনসংখ্যা, প্রযুক্তির প্রসার, শহরায়ন, উৎপাদনশীলতা ও ভোক্তা বাজারের সম্প্রসারণ এই উত্থানের মূলে। ভারত হয়ে উঠবে এক গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব, যেখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক শিল্প ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।
তালিকার চতুর্থ স্থানে থাকবে ইন্দোনেশিয়া, যাদের অর্থনীতি ১৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বিশাল জনসংখ্যা, ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নয়ন দেশটিকে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির কাতারে নিয়ে যাবে। আশ্চর্যজনকভাবে নাইজেরিয়া (১৩.১ ট্রিলিয়ন) এবং পাকিস্তান (১২.৩ ট্রিলিয়ন) পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে উঠে আসবে। এই দুই দেশ জনসংখ্যা, তরুণ শ্রমশক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভিত্তিতে বিশাল বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আফ্রিকার মধ্যে মিশর (১০.৪ ট্রিলিয়ন) সপ্তম স্থানে উঠে আসবে, যা এই মহাদেশের বিকাশমান শক্তিকে প্রকাশ করে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব দেশ উন্নয়নশীল তকমা বহন করে এসেছে, তারা এবার উন্নত বিশ্বের নেতৃত্বে স্থান করে নিচ্ছে।
ব্রাজিল (৮.৭), জার্মানি (৮.১), এবং মেক্সিকো (৭.৬) যথাক্রমে অষ্টম, নবম ও দশম স্থান দখল করবে। এই তালিকায় যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া, ফিলিপাইন, ফ্রান্স এবং বাংলাদেশ ১১ থেকে ১৬ নম্বর স্থানে অবস্থান করবে। এ পর্যায়ে উঠে আসা বাংলাদেশ (৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলার)–এর সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সালে যেটি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ছিল, সেটি ৫০ বছরের ব্যবধানে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
বাংলাদেশের এই উন্নয়ন মূলত হবে তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতি এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। শক্তিশালী ভোক্তা শ্রেণি, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ এই অগ্রগতির চালিকাশক্তি হবে। একই ধরণের অগ্রগতি দেখা যাবে ইথিওপিয়া (৬.২ ট্রিলিয়ন), সৌদি আরব (৬.১ ট্রিলিয়ন) এবং মালয়েশিয়া (৩.৫ ট্রিলিয়ন)–এর মতো দেশেও।
এদিকে, ২০৭৫ সালে প্রথাগত পরাশক্তিগুলোর ভিত কিছুটা দুর্বল হয়ে যাবে। জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স হবে শক্তিশালী অর্থনীতি হলেও তাদের প্রবৃদ্ধি হবে সীমিত। জনসংখ্যা হ্রাস, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির হার, এবং শ্রমবাজার সংকট এই দেশগুলোকে চ্যালেঞ্জে ফেলবে।
রাশিয়া (৬.৯ ট্রিলিয়ন)–এর অর্থনীতিও কিছুটা স্থবির হবে, যা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। কানাডা, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া–এদের অবস্থান হবে ১৯ থেকে ২৪ নম্বরে। অপরদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, আর্জেন্টিনা এবং পেরু ধীরে ধীরে উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই রূপান্তরের পেছনে মূল চালক হিসেবে কাজ করবে:
১. জনসংখ্যাগত পরিবর্তন: তরুণ জনসংখ্যা যেসব দেশে বেশি, সেখানে উৎপাদনশীলতা এবং শ্রম বাজার চাঙা থাকবে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইন এর বড় উদাহরণ।
২. প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, স্বয়ংক্রিয়তা ও ডিজিটাল পেমেন্ট অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
৩. শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: দক্ষ ও শিক্ষিত জনবল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
৪. বহুজাতিক বিনিয়োগ: যে দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে।
৫. জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসইতা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় সক্ষম দেশগুলো টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।
এই পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির ভিত নয়, বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্রও পাল্টে দেবে। বৃহৎ অর্থনীতি মানেই বৃহৎ কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব। ফলে ভারতের মতো দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যেমন বাড়বে, তেমনি আফ্রিকার দেশগুলোকেও নতুন নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা যাবে। বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
২০৭৫ সাল একদম দূরের ভবিষ্যৎ নয়। এখন থেকেই যেসব দেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তিতে দক্ষতা তৈরি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, এবং শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা—তারা-ই একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অর্থনীতির রাজসিংহাসনে বসবে।
এই ভবিষ্যতের অর্থনীতি এক নতুন দিগন্তে পৌঁছাবে, যেখানে কেবল GDP নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্থিতিশীলতা হবে সত্যিকারের সমৃদ্ধির প্রতিচ্ছবি।