ঢাকাবুধবার , ১০ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিষ-রাসায়নিকের মরণফাঁদে বিপন্ন হাওরের বাস্তুসংস্থান

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১০ জুন ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে অতি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করেছে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নতুন এই আইনি বিধানে জলাভূমির ক্ষতি করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে কাগজের এই কঠোরতার আড়ালে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাওরপাড়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো ধরনের তদারকি ছাড়াই বোরো ধানের জমিতে দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক ও কীটনাশক, যা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নিঃশব্দে মিশে যাচ্ছে মুক্ত জলাশয়ে। ফলে প্রয়োগহীনতায় বিষাক্ত হয়ে উঠছে হাওরের অবিনাশী বাস্তুসংস্থান।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইইউসিএন’ এবং বৈচ্ছিক পরিবেশ পোর্টাল ‘দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ’ -এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখলের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ একর জলাভূমি বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাওর ও বিল এলাকায়, যেখানে গত তিন দশকে প্রায় ৫৭ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে অবশিষ্ট জলাভূমিগুলো রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারিকৃত একটি বিশেষ আইনি বিধান, যার অধীনে দেশের যেকোনো অঞ্চলের নিবন্ধিত হাওর, বিল, ঝিল বা প্রাকৃতিক জলাশয় বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে ভরাট, দখল বা এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করলে, কিংবা বিষটোপ ও অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার করে দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও পরিযায়ী পাখিসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন করলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অপরাধের মাত্রাভেদে সুনির্দিষ্ট মেয়াদে কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, বোরো মৌসুমে ফসলের সুরক্ষায় কৃষকেরা কার্বোফুরান ও ডায়াজিনন গ্রুপের মারাত্মক সব কীটনাশক ব্যবহার করছেন। সুনামগঞ্জ সদরের দেখার হাওর এলাকার কৃষক করিম মিয়া বলেন, পোকার আক্রমণে ফসল বাঁচাতে বিষ দেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। তবে এই বিষ যে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে হাওরে গিয়ে মাছের ক্ষতি করছে, সেটা আমরাও টের পাচ্ছি। আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না।

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি হাওরের পানিতে মিশে মা মাছের ডিম্বাশয় ধ্বংস করছে। একই সঙ্গে মাছের প্রধান খাদ্য জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন মেরে ফেলছে, যার ফলে মুক্ত জলাশয়ের দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

রাসায়নিক ও কীটনাশকের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা। দেখার হাওর এলাকার প্রবীণ মৎস্যজীবী সুবল দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাওরে এখন আর আগের মতো চিতল, পাবদা বা আইড় মাছ চোখে পড়ে না। বিষাক্ত পানির কারণে পোনা মাছগুলো শুরুতেই মরে ভেসে উঠছে। আমাদের জীবিকাই এখন হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আনিসুর রহমান জানান, মে-জুন মাস হলো দেশীয় মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুম। ঠিক এই সময়েই বোরো খেতের বিষাক্ত রাসায়নিক মুক্ত জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। এটি মা মাছের ডিম্বাশয় স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেয় এবং রেণু পোনার প্রধান খাদ্য ‘জুপ্ল্যাঙ্কটন’ ধ্বংস করে ফেলে। ফলে মাছ ডিম ছাড়লেও পোনা বেঁচে থাকতে পারছে না।

এদিকে কীটনাশকের এই গোপন থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না পরিযায়ী (অতিথি) পাখিরাও। বিষাক্ত পানি ও কীটনাশকযুক্ত শামুক-কেঁচো খেয়ে প্রতি বছর হাওরাঞ্চলে অসংখ্য পাখি মারা পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খলকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জমিতে যে কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে, তা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যখন হাওরে মিশছে, তখন তা এক প্রকার মারণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। বিষাক্ত শামুক বা ছোট মাছ খেয়ে প্রতি বছর অসংখ্য পরিযায়ী পাখি মারা যাচ্ছে কিংবা চারণভূমি পরিবর্তন করছে। এই উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে এই বিষের ব্যবহার কঠোরভাবে নজরদারি করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন বা শাস্তি বাড়িয়ে হাওরের এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় জরুরি। পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) এবং জৈব-কীটনাশক ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে ‘হাওর অধ্যাদেশ ২০২৬’ কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে বিলীন হয়ে যাবে হাওরের প্রাণ-প্রকৃতি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

এবারের বাজেটে বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে নতুন রেকর্ডের পথে বাংলাদেশ

বিষ-রাসায়নিকের মরণফাঁদে বিপন্ন হাওরের বাস্তুসংস্থান

জাটকা সংরক্ষণে কঠোর অভিযান, দরিদ্র জেলেদের বাড়তি সহায়তা দেবে সরকার

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের বড় পতন, কমতে পারে দেশের বাজারের দামও

দুপুরের মধ্যে ১২ অঞ্চলে ঝড়ের শঙ্কা

তরুণদের সুরক্ষা ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তামাক কর বাড়ানোর দাবি

প্রবাসীদের কল্যাণে একসঙ্গে কাজের অঙ্গীকার হাইকমিশন ও গণমাধ্যমের

বাজেটে সব সিগারেটের দাম বাড়ছে

দেশের বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণ-রুপার দাম

মাঝারি পর্যায়ে ঢাকার বায়ুদূষণ

ইরানে বিমান চলাচল স্বাভাবিক, তেহরানে অবতরণ শুরু হজ ফ্লাইটের