ঢাকাবুধবার , ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বিশ্বরাজনীতিতে কমছে জাতিসংঘের গুরুত্ব!

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭ বিকাল

Link Copied!

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এককালের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) আজ যেন এক ফাঁকা ও পরিত্যক্ত মঞ্চে পরিণত হতে চলেছে। বিশ্বনেতাদের উদাসীনতা, প্রভাবশালী দেশগুলোর অনুপস্থিতি এবং বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রতি অনাস্থার কারণে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি ক্রমশ তার গুরুত্ব ও কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ্ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেশের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতি তুলে ধরে আবেগঘন বক্তব্য দেন। তবে নিজ দেশে এই বক্তব্য প্রশংসিত হলেও বিশ্ব পরিমণ্ডলে তা এক শূন্য ও জনমানবহীন হলে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেছে।

সম্প্রতি দ্যা কাঠমুণ্ড পোস্টে প্রকাশিত নেপালের নিবন্ধকার ও বিশ্বরাজনীতি বিশ্লেষক অনুরাগ আচার্য-এর আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিবিষয়ক এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালে সাম্প্রতিক বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া থেকে শুরু করে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মারাত্মক ফল হিসেবে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী যখন এই বিশ্বজনীন দুর্যোগের কথা তুলে ধরছিলেন, তখন সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষটি ছিল দৃশ্যত খালি। তরুণ নেপালি প্রধানমন্ত্রীর এই হৃদয়বিদারক আহ্বান শোনার জন্য জাতিসংঘের সম্মেলন কক্ষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বড় বড় পরাশক্তি ও প্রভাবশালীদের প্রায় কেউই উপস্থিত ছিলেন না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক সংকটে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্র দিন দিন কতটা সংকুচিত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

প্রকৃতপক্ষে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এমন খালি চেয়ার দেখতে পাওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু সময় আগেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্য বয়কট করে একযোগে হল থেকে বের হয়ে যান বহু দেশের প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে সাধারণ পরিষদের সম্মেলন স্থান ‘টার্টল বে’ থেকে মাত্র ২৫০ মাইল দূরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এক বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন—যা জাতিসংঘের রুটিন বৈঠকের চেয়েও বিশ্বরাজনীতিতে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে ২০১৫ সালের পর রাশিয়ার কোনো প্রেসিডেন্ট এই সাধারণ পরিষদে অংশ নেননি, এমনকি চলতি বছরের বিশ্ব সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীও।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বনেতাদের ফেলে যাওয়া এই খালি চেয়ারগুলো মূলত একটি বিভক্ত ও আত্মকেন্দ্রিক আধুনিক পৃথিবীরই প্রতিচ্ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো মানবজাতির যৌথ সংকটগুলো মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। কিন্তু বড় বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধ এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের কারণে আজ সেই আলোচনার স্থান সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশ্বনেতারা এখন পারস্পরিক আলোচনার চেয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, যার ফলে আধুনিক পৃথিবীর বড় বড় সংকট ও তার সমাধানের বৈশ্বিক নেতৃত্বের মধ্যে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হলো—ন্যাটো, ব্রিকস, জি-৭, কোয়াড এবং সাম্প্রতিক ‘মক্কা প্যাক্ট’-এর মতো রাজনৈতিক ও সামরিক জোটগুলোর নাটকীয় উত্থান। বর্তমানে বিশ্ব একটি বহুপাক্ষিক কাঠামোর দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক ফোরাম বা জাতিসংঘের চেয়ে নিজস্ব বলয় বা জোট গড়ে তুলে নিরাপত্তা ও নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আজও সেই ১৯৪৫ সালের কাঠামোতেই আটকে রয়েছে।

বৈশ্বিক জনসংখ্যা ও অর্থনীতির মূল ভরকেন্দ্র দক্ষিণ গোলার্ধ বা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এ স্থানান্তরিত হলেও নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা ক্যারিবীয় অঞ্চলের স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব নেই, যা একটি চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

নেপালের মতো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো আজ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ভুক্তভোগী। দারিদ্র্য, সংক্রামক ব্যাধি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোকে প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ বন্যা ও পাহাড়ি ধসের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব দেশের নেতারা যখন জাতিসংঘের মঞ্চে এসে তাঁদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলেন, তখন তাঁরা আসলে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেন যে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের দায়ভার সবচেয়ে বেশি বহন করতে হচ্ছে তাঁদেরই, যাঁদের এটি সহ্য করার সক্ষমতা সবচেয়ে কম। বিশ্বনেতারা যদি জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুর্বল দেশগুলোর এই সতর্কবার্তা এবং হাহাকার উপেক্ষা করতেই থাকেন, তবে ক্ষতি কেবল জাতিসংঘের একার কর্তৃত্বেরই হবে না—বরং সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

যে ব্যাঙের পিঠের চামড়া ফুঁড়ে জন্ম নেয় বাচ্চা, অদ্ভুত এই ব্যাঙের নাম কী?

সরাইলে ট্রাকচাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

যুক্তরাষ্ট্রে হারিকেন ইসাইয়াসের প্রভাবে ৮ জনের মৃত্যু

ই-বর্জ্য থেকে নতুন পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিদেশি বিনিয়োগ খুঁজছে সরকার

আগামী পাঁচ দিন যেসব বিভাগে হতে পারে বৃষ্টি, কমতে পারে তাপমাত্রা

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম

দেশের বাজারে স্বর্ণের নতুন দাম, আজ বিক্রি হচ্ছে যে দরে

৫ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়ার শঙ্কা

বিশ্বরাজনীতিতে কমছে জাতিসংঘের গুরুত্ব!

রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, আহত ২৭

Xiaomi Offers Special Deals for Puja

পূজা উপলক্ষে আকর্ষণীয় অফার নিয়ে এলো শাওমি