
প্রকৃতিতে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের শারীরিক গঠন ও জীবনধারণের পদ্ধতি মানুষকে বিস্মিত করে। তেমনই এক অদ্ভুত উভচর প্রাণী সুরিনাম টোড (Surinam Toad)। বৈজ্ঞানিক নাম Pipa pipa। দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা পাতার মতো এই ব্যাঙের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রজননপ্রক্রিয়া। সাধারণ ব্যাঙের মতো পানিতে ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে স্ত্রী সুরিনাম টোড নিজের পিঠের চামড়ার ভেতর ডিম ধারণ করে। কয়েক মাস পর সেই চামড়া থেকে বেরিয়ে আসে সম্পূর্ণ বিকশিত ছোট ছোট ব্যাঙ। প্রাণিজগতের এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যই সুরিনাম টোডকে অন্য অনেক উভচর প্রাণী থেকে আলাদা করেছে।
দেখতে কেমন সুরিনাম টোড?
সুরিনাম টোডের শরীর অত্যন্ত চ্যাপ্টা, চওড়া এবং কিছুটা চারকোনা আকৃতির। এর গায়ের রং সাধারণত বাদামি, ধূসর-বাদামি কিংবা জলপাই রঙের হয়ে থাকে। শরীরের এই গঠন ও রং পানির তলদেশের কাদা, পচা পাতা ও অন্যান্য জৈব পদার্থের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে সাহায্য করে। ফলে শিকারি প্রাণীর চোখে পড়া এড়ানো এবং শিকারের জন্য অপেক্ষা করা-দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা পায় ব্যাঙটি।

পূর্ণবয়স্ক সুরিনাম টোডের দৈর্ঘ্য সাধারণত প্রায় ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার হতে পারে। এর মাথা তুলনামূলকভাবে চ্যাপ্টা ও ত্রিকোণাকার। চোখ ছোট এবং চোখের পাতা নেই। এদের দাঁত ও জিহ্বাও নেই। সামনের পা তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও আঙুলগুলো লম্বা ও সরু। পেছনের পা শক্তিশালী এবং আঙুলের মাঝখানে জালিকার মতো পর্দা থাকায় পানিতে চলাচল ও সাঁতার কাটতে সুবিধা হয়।
আঙুলের ডগায় তারার মতো সংবেদনশীল অংশ
সুরিনাম টোডের সামনের পায়ের আঙুলের ডগায় ছোট ছোট তারার মতো সংবেদনশীল অংশ রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাণীটি ‘স্টার-ফিঙ্গারড ফ্রগ’ নামেও পরিচিত। পানির নিচে খাবার খোঁজার সময় এই সংবেদনশীল অংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাদার মধ্যে বা আশপাশে থাকা শিকারের উপস্থিতি অনুভব করতে এগুলোকে ব্যবহার করে ব্যাঙটি।

জিহ্বা না থাকায় সুরিনাম টোড অন্য অনেক ব্যাঙের মতো জিহ্বা ছুড়ে দিয়ে শিকার ধরে না। বরং শিকারের অবস্থান বুঝতে পারলে দ্রুত মুখের কাছে নিয়ে আসে এবং সামনের আঙুলের সাহায্যে খাবার মুখে প্রবেশ করায়। এভাবে পানির তলদেশে খাবার খুঁজে খাওয়ার জন্য তাদের শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে।
কোথায় বাস করে এই ব্যাঙ?
সুরিনাম টোড মূলত দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা। ব্রাজিল, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, পেরু, সুরিনাম, গায়ানা ও ফরাসি গায়ানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা যায়। ক্যারিবীয় অঞ্চলের ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতেও এদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে।
অনেক ব্যাঙের মতো এরা ডাঙা ও পানি-দুই জায়গায় সমানভাবে জীবন কাটায় না। সুরিনাম টোড প্রায় সম্পূর্ণ জলজ প্রাণী। ধীরগতির নদী, খাল এবং কাদাযুক্ত পানির তলদেশে এদের বসবাস। পানির নিচে কাদা ও পচা পাতার মধ্যে লুকিয়ে থেকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। ফলে বাইরে থেকে সহজে এদের শনাক্ত করা কঠিন।
কী খায়, কীভাবে শিকার করে?
সুরিনাম টোড মূলত ছোট জলজ প্রাণী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের খাদ্যতালিকায় কেঁচো, জলজ পোকামাকড়, ছোট ক্রাস্টেশিয়ান বা খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী এবং ছোট মাছ রয়েছে। পানির তলদেশে খাবারের সন্ধানে এরা সামনের পায়ের সংবেদনশীল আঙুল ব্যবহার করে।

শিকার ধরার ক্ষেত্রে এরা অনেক সময় ওত পেতে থাকে। কোনো ছোট প্রাণী কাছাকাছি এলে দ্রুত সেটিকে মুখে নেওয়ার চেষ্টা করে। জিহ্বার পরিবর্তে সামনের আঙুলের সাহায্যে খাবার মুখে প্রবেশ করানোর এই কৌশল তাদের খাদ্যগ্রহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পিঠের চামড়ায় ডিম ধারণ, তারপর জন্ম নেয় বাচ্চা
সুরিনাম টোডের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রজননপ্রক্রিয়া। স্ত্রী ব্যাঙের পিঠে ডিম ধারণের এই পদ্ধতি অন্য অনেক পরিচিত ব্যাঙের প্রজননপ্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রজননের সময় পুরুষ ও স্ত্রী সুরিনাম টোড পানির নিচে বিশেষ ধরনের ঘূর্ণন বা ডিগবাজির মতো আচরণ করে। এ সময় স্ত্রী ব্যাঙ ডিম ছাড়ে এবং পুরুষ ব্যাঙ সেগুলো নিষিক্ত করে। এরপর ডিমগুলো স্ত্রী ব্যাঙের পিঠে স্থাপিত হয়। পুরুষ ব্যাঙের সহায়তায় ডিমগুলো পিঠের চামড়ার সঙ্গে আটকে যায়। সাধারণত প্রায় ১০০টি ডিম পর্যন্ত ধারণ করতে পারে স্ত্রী সুরিনাম টোড।
ডিমগুলো পিঠে স্থাপিত হওয়ার পর স্ত্রী ব্যাঙের চামড়া ধীরে ধীরে সেগুলোকে ঘিরে ফেলে। প্রতিটি ডিমের চারপাশে চামড়ার ছোট ছোট কোটর তৈরি হয়। ফলে পিঠে মৌচাকের মতো অসংখ্য ছোট গর্ত দেখা যায়। এই কোটরগুলোর ভেতরেই ডিমের বিকাশ চলতে থাকে।

সাধারণ ব্যাঙের ক্ষেত্রে ডিম ফুটে প্রথমে ব্যাঙাচি বের হয়। পরে ব্যাঙাচি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হয়। কিন্তু সুরিনাম টোডের ক্ষেত্রে বিকাশের প্রক্রিয়াটি ভিন্ন। ডিমের ভেতরেই ভ্রূণের বিকাশ ঘটে এবং ব্যাঙাচির পর্যায়টি পিঠের চামড়ার কোটরের মধ্যে সম্পন্ন হয়। প্রায় তিন থেকে চার মাস পর সেখান থেকে ছোট ছোট পূর্ণাঙ্গ আকৃতির ব্যাঙ বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ, এরা সাধারণ ব্যাঙের মতো মুক্তভাবে সাঁতার কাটা ব্যাঙাচি হিসেবে মায়ের পিঠ থেকে বের হয় না; বরং ব্যাঙের মতোই বিকশিত অবস্থায় বেরিয়ে আসে।
বাচ্চাগুলো বেরিয়ে আসার পর স্ত্রী ব্যাঙের পিঠের চামড়ার ওপরের স্তর বদলে যায়। প্রজননের এই বিশেষ পদ্ধতির কারণে সুরিনাম টোডকে প্রাণিজগতের অন্যতম ব্যতিক্রমী উভচর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের অনন্য উদাহরণ
সুরিনাম টোডের চ্যাপ্টা শরীর, ছোট চোখ, সংবেদনশীল আঙুল এবং পিঠে ডিম ধারণের পদ্ধতি-সবকিছুই তার জীবনধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। পানির তলদেশে লুকিয়ে থাকা, খাবার খুঁজে বের করা এবং ডিমের বিকাশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করা-এসব বৈশিষ্ট্য প্রজাতিটির অভিযোজনের পরিচয় দেয়।

তবে সুরিনাম টোডের পিঠের চামড়ায় ডিম ধারণের পদ্ধতিকে সব ব্যাঙের সাধারণ বৈশিষ্ট্য মনে করা ঠিক নয়। এটি এই প্রজাতির বিশেষ প্রজননকৌশল। প্রাণিজগতের বিভিন্ন প্রজাতি কীভাবে নিজেদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, সুরিনাম টোড তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সংরক্ষণ অবস্থা কেমন?
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) রেড লিস্টে সুরিনাম টোডকে ‘ন্যূনতম উদ্বেগজনক’ (Least Concern) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে বলে প্রজাতি-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ, বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রজাতিটিকে বর্তমানে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। তবে এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ এই নয় যে, এর আবাসস্থল বা পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
জলজ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নদী ও জলাভূমির অবক্ষয়, পানিদূষণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তন এ ধরনের প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতির বিস্ময়, বিজ্ঞানের কৌতূহল
সুরিনাম টোডের জীবনচক্র দেখায়, প্রকৃতিতে বংশবিস্তারের পদ্ধতি কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে। সাধারণ ব্যাঙের পরিচিত জীবনচক্রের বাইরে গিয়ে পিঠের চামড়ার ভেতরে ডিমের বিকাশ এবং সেখান থেকে ছোট ব্যাঙের বেরিয়ে আসা সত্যিই ব্যতিক্রমী। এই বৈশিষ্ট্য শুধু কৌতূহলই তৈরি করে না, বরং প্রাণীদের অভিযোজন ও বিবর্তন সম্পর্কে জানারও সুযোগ করে দেয়।
দেখতে সাধারণ একটি চ্যাপ্টা পাতার মতো মনে হলেও সুরিনাম টোডের জীবনধারণের কৌশল অত্যন্ত বিশেষ। জলজ পরিবেশে টিকে থাকা থেকে শুরু করে বংশবিস্তার—প্রতিটি পর্যায়েই রয়েছে প্রকৃতির নিজস্ব বিস্ময়।