ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে জীবন: কোন দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী?

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৫ জুলাই ২০২৫, ৯:১৩ সকাল

Link Copied!

ধরা যাক, একটি সকালে আপনি ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে বাইরের দৃশ্য দেখলেন। গলির মোড়ে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কিশোরটি যেমন মোবাইলে ইউটিউব স্ক্রল করছে, তেমনি রিকশাচালকটিও হালকা বিরতিতে ফেসবুকের ভিডিও ঘাঁটছেন। অথচ দশ বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল দুর্লভ। স্মার্টফোন আজ শুধু একটি প্রযুক্তিপণ্য নয়, বরং মানুষের জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব এতটাই গভীর যে, এখন বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, এমনকি সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কও স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা যদি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের দিকে নজর দিই, তাহলে একটি বিস্ময়কর চিত্র ভেসে ওঠে। আর সে চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও অনেকটাই তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর দেশ হলো চীন। দেশটির স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮৫৯.৩৮ মিলিয়ন, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। জনসংখ্যার বিচারে প্রথম স্থানে থাকা এই দেশটি প্রযুক্তি খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর দাপটের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিশাল আকারের স্মার্টফোন ব্যবহার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। শাওমি, অপো, ভিভো কিংবা হুয়াওয়ের মতো ব্র্যান্ডগুলো চীনের সাধারণ জনগণের হাতের নাগালে স্মার্টফোন পৌঁছে দিয়েছে। চীন সরকারের প্রযুক্তিবান্ধব নীতিমালা এবং ডিজিটাল রূপান্তরকেন্দ্রিক পরিকল্পনাও এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।

চীনের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, যেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০০.৫৮ মিলিয়ন। ভারতের স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশটির মোবাইল নেটওয়ার্ক খাতের প্রতিযোগিতা, বিশেষত জিও-র মতো কোম্পানির সাশ্রয়ী ইন্টারনেট প্যাকেজ, সাধারণ মানুষের কাছে স্মার্টফোন ব্যবহারের পথ সহজ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর মধ্যবিত্ত শ্রেণির দ্রুত প্রসার, স্মার্টফোন বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব ভাষায় অ্যাপ ও কনটেন্ট সহজলভ্য হওয়ার ফলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি আরও বেগবান হয়েছে।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩১০.১২ মিলিয়ন। যদিও এটি জনসংখ্যার তুলনায় চীন ও ভারতের চেয়ে কম, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্মার্টফোন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আইফোনের উৎপাদক অ্যাপলের জন্ম এই দেশেই, আর এখান থেকেই স্মার্টফোন বিপ্লব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং ইরান পরবর্তী দশটি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে, যাদের প্রত্যেকের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ থেকে ১৭৩ মিলিয়নের মধ্যে। ইন্দোনেশিয়ার মতো দ্বীপদেশ, যার জনসংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি, সেখানে স্মার্টফোন একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অনলাইন ব্যবসা, শিক্ষা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বিস্তৃতি স্থানীয় জীবনমানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

মজার ব্যাপার হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান এবং ইউরোপের দেশ তুরস্ক প্রায় সমান সংখ্যক স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছে – যথাক্রমে ৭৫.৭৬ এবং ৭৫.১১ মিলিয়ন। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও ইরান তার অভ্যন্তরীণ অ্যাপ ও পরিষেবা চালু করে প্রযুক্তির জগতে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। অপরদিকে, তুরস্ক ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে অবস্থান করায় এই অঞ্চলে প্রযুক্তির ছোঁয়া দ্রুত পৌঁছেছে।

এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ তালিকার ২০তম স্থানে রয়েছে, যেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৪.৪৪ মিলিয়ন। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষ এখন স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর, মোবাইল অপারেটরদের বিস্তার, কম দামে স্মার্টফোন সরবরাহ এবং সরকার ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচির ফলেই এই সংখ্যা এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং গার্মেন্টস কর্মীদের মধ্যে স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এই প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এদিকে আফ্রিকান দেশ নাইজেরিয়াও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। দেশটির প্রায় ৫১.৫১ মিলিয়ন মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, যা মহাদেশটির মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলিতেও ডিজিটাল রূপান্তর কতটা গতিশীল।

ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং ইতালি প্রত্যেকেই তাদের প্রযুক্তি-সহজতাসম্পন্ন সমাজে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর বড় একটা অংশ ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে ৫৩.৬৯ মিলিয়ন, জার্মানিতে ৬৯.০৯ মিলিয়ন, যুক্তরাজ্যে ৫৬.৯৩ মিলিয়ন এবং ইতালিতে ৪৮.১২ মিলিয়ন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া, যাকে বিশ্ব প্রযুক্তির গুরুকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪১.৩২ মিলিয়ন। যদিও এটি তুলনামূলক কম বলে মনে হতে পারে, তবে দেশটির মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশই স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকে। স্যামসাং-এর মতো জায়ান্ট প্রযুক্তি কোম্পানি এখানকার জন্মভূমি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে স্মার্টফোনের আধুনিক সংস্করণ ও বৈচিত্র্য সহজলভ্য।

উল্লেখযোগ্যভাবে, মেক্সিকো (৭২.০৮ মিলিয়ন), মিশর (৭১.৩৬ মিলিয়ন), ভিয়েতনাম (৮৫.৭৩ মিলিয়ন), থাইল্যান্ড (৪১.৯৬ মিলিয়ন), আর্জেন্টিনা (৪১.১০ মিলিয়ন) এবং কানাডা (৩৬.১৮ মিলিয়ন) – এই দেশগুলোও তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে স্মার্টফোন প্রযুক্তির বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর এই বিস্ময়কর বৃদ্ধি সমাজে নানা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে যেমন এই প্রযুক্তি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি অন্যদিকে এটি নতুন প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়িয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ডিজিটাল বিভাজনের মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে এখনও ইন্টারনেট কাভারেজ সম্পূর্ণ হয়নি কিংবা স্মার্টফোনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, সেখানে ডিজিটাল বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্কও এখন পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা এবং রিমোট অফিস সিস্টেমগুলো স্মার্টফোন কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ফলে অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘুরছে। বিশেষত, কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের উপর নির্ভরতা বহুগুণে বেড়ে গেছে।

তবে প্রযুক্তির এই প্রবল স্রোতের মাঝে কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে। যেমন, শিশুদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন আসক্তি, ভুয়া তথ্যের সহজ ছড়ানো, গোপনীয়তার সংকট এবং মনোযোগের অভাব – এসব বিষয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে। ডিজিটাল শিক্ষা ও বিজ্ঞাপননির্ভর বাজার ব্যবস্থাও স্মার্টফোনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলছে।

শেষমেশ, স্মার্টফোন আজ আর কেবল একটি যন্ত্র নয়। এটি মানুষের চিন্তা-চেতনা, যোগাযোগ ও উপার্জনের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ২০২৪ সালের এই বৈশ্বিক চিত্র বলছে, বিশ্বের প্রতিটি কোণায় কোণায় স্মার্টফোনের ছোঁয়া পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার ও সামাজিক দিকসমূহ বিবেচনা করেই আগামী দিনে আমাদের এগোতে হবে। নয়তো প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ একদিন অভিশাপে পরিণত হওয়াও বিচিত্র নয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস