ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বায়ু-শব্দ-দৃষ্টি-পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিকারে বাপার ১০ দফা সুপারিশ

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৪ বিকাল

Link Copied!

রাজধানীতে বায়ু, শব্দ, দৃষ্টি, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিকারে ১০ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিকমিয়া হলে ‘বায়ু-শব্দ-দৃষ্টি-পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ: প্রতিকার কতদূর?’ শীর্ষক সেমিনারে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় সেমিনারে পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ ও নির্বাহী সদস্য আহসান রনি। বায়ু ও শব্দদূষণ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন এবং বাপার নির্বাহী সদস্য ও নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, রাত ১২টার পর দেশের সব বিলবোর্ড বন্ধ করা হলে দৃষ্টিদূষণ কমার পাশাপাশি বিপুল বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হবে। বর্ষার পর কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা সব ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এসব ইটভাটার অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।

তিনি বলেন, এখন পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের দিকে যেতে হবে। দেশের তরুণদের পরিবেশ রক্ষার কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধের পাশাপাশি ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, দেশে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার রোধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে পরিবেশসম্মত বিকল্প উদ্ভাবন, বাজারজাত ও সহজলভ্য করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই উৎপাদিত হয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টন। দেশে বছরে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। মোট বর্জ্যের ৫৫ শতাংশ অপরিকল্পিতভাবে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়।

তিনি বলেন, শহরাঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালে ৩ কেজি থেকে বেড়ে প্রায় ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় এই পরিমাণ ২২ দশমিক ২৫ কেজি। শিল্পবর্জ্য, ই-বর্জ্য, লিচেট ও প্লাস্টিক নদী-জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানি ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। পানি নিষ্কাশনে ৮০ শতাংশ বাধার কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক।

প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ রোধে 3R আইন দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান তিনি। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে উপযুক্ত বিকল্প ব্যবহারের পাশাপাশি জৈবভিত্তিক প্লাস্টিক ব্যাগকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন তিনি। তবে এসব পণ্যের জৈব-পচনশীলতা তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ অদৃশ্য সংক্রামক ও জীবনঘাতী সংকট। EIU ২০২৫-এর Livability Index-এ ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম। EPIC-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু প্রায় ৫ দশমিক ৫ বছর কমছে।

তিনি বলেন, CREA-এর হিসাবে প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত রোগে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মারা যান। বিশ্বব্যাংকের মতে, পরিবেশ দূষণে বাংলাদেশের জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। শীতকালে ঢাকার AQI প্রায়ই ২০০ থেকে ৩০০ ছাড়িয়ে যায়।

বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ৩০ শতাংশ, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা ২৯ শতাংশ, যানবাহন ১৫ শতাংশ, আন্তঃদেশীয় দূষণ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, গৃহস্থালি চুলার ধোঁয়া ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বর্জ্য পোড়ানো ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়।

শব্দদূষণ বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকার ৮২ শতাংশ স্থানে শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের বেশি। ফার্মগেট, শাহবাগ ও গাবতলীর মতো এলাকায় শব্দের মাত্রা ৮০ থেকে ১১০ ডেসিবেলে পৌঁছায়। এতে শ্রবণশক্তি ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।

দৃশ্যদূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় বিলবোর্ডের সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫১ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৯৯৭টিতে পৌঁছেছে। এতে চোখের ক্লান্তি, মাথাব্যথা, নগর সৌন্দর্যহানি ও বসবাসযোগ্যতার অবনতি ঘটছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ হলেও কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দেশে মানুষের মৃত্যুর হার বাড়ছে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ব্যাটারির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে দেশে লেডের পরিমাণও বেড়েছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দূষণ কমিয়েছে, সেই মডেল অনুসরণ করার পরামর্শ দেন তিনি। বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান।

এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, মানুষ বায়ুর মাধ্যমে ৭০ শতাংশ পার্টিকেল শরীরে গ্রহণ করছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে বারবার কাশিসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যাচ্ছে। দৃষ্টিদূষণের কারণে অনেকে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি ‘পে-পলিউটার’ নীতি বাস্তবায়ন এবং ট্রান্সবাউন্ডারি আইন কার্যকরে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের দাবি জানান।

বাপার নির্বাহী সদস্য ও নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, পরিবেশ দূষণকারীদের শাস্তির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে। পলিথিনের বিকল্প উদ্ভাবনকারীদের সার্বিক সহযোগিতা ও প্রণোদনার আহ্বান জানান তিনি। দখল ও দূষণ রোধে জনগণের সম্পৃক্ততা, প্রণোদনা ও কর্মপরিকল্পনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাপার নির্বাহী সদস্য আহসান রনি বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণে অবদান রাখা বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। প্রতিদিন আড়াই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ ফেলে দেওয়া হয়। এসব পলিথিন ড্রেনে পড়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত করে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ২০০০ সালে নিষিদ্ধ হওয়া পলিথিন কয়েক বছরের মধ্যে আবার ফিরে এসে নবম স্থান দখল করেছে। এর দায় শুধু জনগণের নয়, সরকার ও এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদেরও রয়েছে।

সেমিনার থেকে বায়ু, শব্দ, দৃষ্টি, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিকারে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো-ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়ার যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা; শিক্ষাক্রমে বায়ুমান অন্তর্ভুক্ত করা; অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও সরকারি কাজে ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা; সিগন্যাল অটোমেশন ও Mini Asphalt Plant প্রযুক্তি চালু করা; শিল্পকারখানায় অনলাইন বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা; শব্দদূষণ বিষয়ে ৯৯৯ ও হটলাইনের প্রচার বাড়ানো; শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা; যানবাহনের নিয়মিত শব্দ পরীক্ষা করা; রাত ১০টার পর LED লাইট নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঝুলন্ত তার গুছিয়ে রাখা।

সেমিনারে বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান ও হুমায়ুন কবির সুমন, নির্বাহী সদস্য মো. আশরাফ আমিরুল্লাহ, মোনসেফা তৃপ্তি ও মাহমিদা নাজনিনসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলেই কেন হঠাৎ মন খারাপ, কী এই ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’?

upay Rewards Three Distributor Partners with Umrah Packages under ‘Shopner Umrah 2026’ Campaign

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু

ভিভো ভি৮০: নতুন রং ও নতুন ডিজাইনে আসছে নতুন চমক