ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জীবন বীমা ও ব্যাংক
  3. লাইফস্টাইল

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ সকাল

Link Copied!

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ২৯ অক্টোবর হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে এসব সম্পদ সরিয়ে নেয়। চুরির বড় অংশ সম্পন্ন হয় মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে। বিপুল অঙ্কের এই চুরি শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেই নয়, বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে কীভাবে এত দ্রুত অর্থ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ আটকে দেওয়া, গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ এবং হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

কীভাবে ঘটল এত বড় চুরি?

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন এবং বাইন্যান্সের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর রাত ৮টা ৫ মিনিট UTC-তে প্রতিষ্ঠানটির হট ওয়ালেট আক্রান্ত হয়। হট ওয়ালেট হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেট, যা নিয়মিত ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে ব্যবহৃত হয়।

বাইন্যান্সের হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চুরির বড় অংশ মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।

প্রাথমিকভাবে বাইন্যান্স ধারণা করেছিল, কোনো কর্মীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে হামলাটি হয়ে থাকতে পারে। তবে পরবর্তী তদন্তে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তাব্যবস্থার আরও কয়েকটি দুর্বলতার সন্ধান পায়।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের মতে, হ্যাকাররা বাইন্যান্সের লেনদেন অনুমোদনের অবকাঠামো বা সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে হ্যাকাররা অনুমোদন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারে।

অর্থাৎ, শুধু ওয়ালেটের নিরাপত্তা ভাঙাই নয়, অর্থ ছাড় করার অনুমোদন ব্যবস্থায় প্রবেশের ঘটনাও এই হামলাকে ভয়াবহ করে তুলেছে।

কারা এই হামলার পেছনে?

এই সাইবার হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার ইউনিট ট্রেডারট্রেইটর (TraderTraitor) এই হামলার জন্য দায়ী। এর আগে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির বিভিন্ন ঘটনায়ও গোষ্ঠীটির নাম এসেছে।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এবং চেইনঅ্যানালাইসিসও হামলার ধরন ও লেনদেন বিশ্লেষণ করে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছিল।

তবে এ বিষয়ে বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ৩১ অক্টোবর এক বক্তব্যে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত নয় বলে মন্তব্য করেন। ফলে এফবিআইয়ের দায় নির্ধারণ এবং অন্যান্য পক্ষের মূল্যায়ন থাকলেও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

চুরি হওয়া অর্থের কতটা আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে?

হামলার পর চুরি হওয়া অর্থ শনাক্ত ও আটকে দিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ শুরু করে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেথার, সার্কেল, রিপলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে সম্পদ আটকে দেওয়া মানেই তা বাইন্যান্সের কাছে ফেরত চলে আসা নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ক্রিপ্টোকারেন্সি একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। টেথারের ইউএসডিটি (USDT) ও সার্কেলের ইউএসডিসির (USDC) মতো স্টেবলকয়েনের ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সম্পদ আটকে দিতে পারে। কিন্তু বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের মতো বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সি সরাসরি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় না।

টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের বিটকয়েন ও ইথেরিয়াম এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো সরাসরি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আটকে দেওয়া সম্ভব নয়।

গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ বাইন্যান্সের

এত বড় সাইবার হামলার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও বাইন্যান্স জানিয়েছে, এই ঘটনার আর্থিক ক্ষতি গ্রাহকদের বহন করতে হবে না।

প্রতিষ্ঠানটির ৩০ অক্টোবরের বিবৃতিতে বলা হয়, চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতি তাদের নিজস্ব তহবিল এবং সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্সের (SAFU) মাধ্যমে পূরণ করা হবে। এজন্য ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংরক্ষণের কথাও জানায় তারা।

পরবর্তী ৩১ অক্টোবরের হালনাগাদে বাইন্যান্স জানায়, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের সংস্থান করা হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ তুলনামূলক কম লেনদেন হওয়া ও কম তারল্যের টোকেন হওয়ায় সংগ্রহ করতে আরও সময় লাগতে পারে।

সর্বশেষ ২ নভেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইন্যান্স চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ পুনরায় সংস্থান করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে বিকল্প টোকেন কিনে এই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে।

হামলার পর গ্রাহকদের মধ্যে কী প্রভাব পড়েছে?

এই ঘটনার পর বাইন্যান্সের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কতটা অটুট রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রয়টার্সের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর বাইন্যান্স থেকে গ্রাহকেরা নিট ৩৬৪ কোটি ডলারের সম্পদ তুলে নিয়েছেন। যা প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ এখন স্থিতিশীল হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির উত্তোলনসেবা চালু করা হয়েছে।

এদিকে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের দাম কমে যায়। একই সঙ্গে স্পট বিটকয়েন ইটিএফ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যায় এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়।

কেন সাইবার জগতে এত আলোড়ন?

বাইন্যান্সের এই ঘটনা কয়েকটি কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রথমত, চুরির পরিমাণ অত্যন্ত বড়। প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, বড় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের লেনদেন অনুমোদন ব্যবস্থায় হ্যাকারদের প্রবেশের ঘটনা অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও সতর্কবার্তা।

তৃতীয়ত, ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বাইন্যান্স থেকে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন এবং বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের দামে পতন দেখিয়েছে, বড় ধরনের সাইবার হামলা পুরো বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব সামনে এসেছে। চুরি হওয়া অর্থ শনাক্ত ও আটকে দিতে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান, ব্লকচেইন বিশ্লেষক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই ঘটনা?

বাইন্যান্সের এই সাইবার হামলা ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার ও লেনদেন যত বাড়ছে, সাইবার অপরাধীদের আক্রমণের কৌশলও তত জটিল হচ্ছে।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু ডিজিটাল ওয়ালেট সুরক্ষিত রাখলেই হবে না; লেনদেন অনুমোদন ব্যবস্থা, কর্মীদের ব্যবহৃত ডিভাইস, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত হামলা শনাক্ত করার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক হতে হবে। কোনো একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সব ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণ না করে ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা বেছে নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যর্থতার উদাহরণ নয়; এটি বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য বড় পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র:
১. রয়টার্স, ৩০ অক্টোবর ২০২৬: Gone in 20 minutes: How the biggest heist in crypto history unfolded।

২. রয়টার্স, ২ নভেম্বর ২০২৬: Binance sees outflows stabilising as exchange returns online after $6.3 billion heist।

৩. বাইন্যান্স, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: Recovery Update #3: 90% of Stolen Assets Replenished।

৪. রয়টার্স, ৩০ অক্টোবর ২০২৬: টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ ও উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রতিবেদন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা

দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর চালু হলো মিরপুরের তিন মেট্রোরেল স্টেশন