
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে নানামুখী শারীরিক পরিবর্তন আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিপাকক্রিয়া এবং পুষ্টির চাহিদাও ভিন্নরূপ নেয়। কিন্তু অনেকেই জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস বা ডায়েট বজায় রাখেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের চাহিদানুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স অনুযায়ী খাদ্যতালিকা পরিবর্তন না করলে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা, স্থূলতা এবং পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবদেহের বয়স যখন বাড়তে থাকে, তখন তার জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোতেও পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পেশির ভর হ্রাস পাওয়া এবং শরীরের মেটাবলিক রেট বা বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়া। ২০ বা ৩০ বছর বয়সে শরীরে শক্তির যে চাহিদা থাকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেকেই বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ক্যালরি গ্রহণ বা খাওয়ার পরিমাণ কমান না। এর ফলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে, যা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যতালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হয় প্রোটিন বা আমিষের ক্ষেত্রে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পেশি ও হাড় দুর্বল হতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সারকোপেনিয়া বলা হয়। পেশির এই ক্ষয় রোধ করতে এবং শারীরিক শক্তি বজায় রাখতে বয়স্কদের খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন রাখা অত্যন্ত জরুরি। অথচ অনেক বয়স্ক মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রোটিন গ্রহণ করে থাকেন। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল এবং বিভিন্ন বীজজাতীয় খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া যায়, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যতালিকায় আরও বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
প্রোটিনের পাশাপাশি হাড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডির ভূমিকা অপরিসীম। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে এবং অস্টিওপোরোসিস-এর মতো সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ছোট মাছ এবং শাকসবজি নিয়মিত খাওয়া উচিত। এছাড়া পর্যাপ্ত রোদ পোহানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দারুণ কার্যকর।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিপাকতন্ত্র বা হজমশক্তিও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য বা গ্যাসের সমস্যা এড়াতে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার রাখা বাধ্যতামূলক। ফলমূল, শাকসবজি, লাল চালের ভাত এবং ওটস বা নানা ধরনের ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ বয়স বাড়লে অনেক সময় মানুষের পানির তৃষ্ণা পাওয়ার অনুভূতি কিছুটা কমে যায়, যা ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাদ্যাভ্যাস কেবল শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, এটি বার্ধক্যের ছাপ কমাতেও এবং মানসিক সতেজতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেক সময় দেখা যায়, বয়স বাড়ার পর মানুষ একা হয়ে পড়েন কিংবা তাদের রান্নার আগ্রহ কমে যায়, যার ফলে তারা অস্বাস্থ্যকর বা পুষ্টিহীন প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই অভ্যাসগুলো শরীরকে আরও দ্রুত বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দেয়। তাই প্রতিটি বয়সে শরীরের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে মূল্যায়ন করে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনা উচিত।