
সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকায় টহল জোরদার, কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি বিবৃতি এবং সেনা মোতায়েনের কারণে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চোখে পড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে দুটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তুলনা করে দেখলে বোঝা যায়, বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কারা কেমন ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে থাইল্যান্ড অনেকটাই এগিয়ে। ২০২৪ সালের বৈশ্বিক সামরিক খরচ অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে কম্বোডিয়ার বাজেট মাত্র ৮৬০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বাজেটেই রয়েছে প্রায় সাত গুণের পার্থক্য। এই আর্থিক ব্যবধান প্রতিফলিত হয়েছে সামরিক সরঞ্জাম, আধুনিকায়ন ও কৌশলগত সক্ষমতায়।
জনসংখ্যার দিক থেকে থাইল্যান্ডের রয়েছে ৬৯.৯ মিলিয়ন নাগরিক, যা কম্বোডিয়ার ১৭.১ মিলিয়নের তুলনায় চারগুণেরও বেশি। বড় জনসংখ্যার কারণে থাই সেনাবাহিনীতে সক্রিয় সদস্যের সংখ্যাও বেশি – ৩৬০,৮৫০ জন, যেখানে কম্বোডিয়ার রয়েছে ২২১,০০০ জন সক্রিয় সদস্য। তবে চমকপ্রদভাবে, কম্বোডিয়ার কোনো রিজার্ভ সেনা নেই, অন্যদিকে থাইল্যান্ডের রয়েছে ২ লাখ সংরক্ষিত সেনা সদস্য।
আকাশপথে থাইল্যান্ডের আধিপত্য স্পষ্ট। থাই বাহিনীর হাতে রয়েছে ৭২টি ফাইটার জেট এবং ২৫৮টি হেলিকপ্টার। তুলনায়, কম্বোডিয়ার কাছে নেই একটি ফাইটার জেটও এবং হেলিকপ্টার আছে মাত্র ২১টি। এর মানে, আকাশযুদ্ধে কম্বোডিয়া একেবারেই দুর্বল।
স্থলযুদ্ধে কম্বোডিয়ার একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান হলো, তাদের কাছে ৬৪৪টি ট্যাংক রয়েছে, যা থাইল্যান্ডের ৬৩৫টি ট্যাংকের চেয়েও কিছুটা বেশি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ট্যাংকের মডেল ও প্রযুক্তি। থাইল্যান্ডের অধিকাংশ ট্যাংক আধুনিক এবং আপগ্রেডেড, যেখানে কম্বোডিয়ার অনেক ট্যাংকই পুরোনো সোভিয়েত আমলের।
নৌবাহিনীতেও থাইল্যান্ড এগিয়ে। থাই নৌবাহিনীর ৪৯টি পেট্রোল ভেসেল রয়েছে, যেখানে কম্বোডিয়ার আছে ২০টি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় এই নৌ সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
অবকাঠামোর দিক থেকেও থাইল্যান্ড অনেক বেশি প্রস্তুত। দেশটিতে ১০৮টি বিমানবন্দর রয়েছে, যা প্রতিরক্ষা ও জরুরি অবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার রয়েছে মাত্র ১৩টি বিমানবন্দর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির এই ব্যাপক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও কম্বোডিয়া পুরোপুরি নিরুৎসাহিত হবে এমন নয়। ইতিহাস বলছে, ছোট দেশগুলো কখনো কখনো চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তবুও, থাইল্যান্ডের সাথে যেকোনো সরাসরি সংঘাতে কম্বোডিয়ার কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা দুর্বলতা মারাত্মকভাবে প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
যদিও উভয় দেশের সরকার এখনো সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তবে সীমান্তে সেনা জড়ো করা, নজরদারি বাড়ানো এবং রণপ্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা। জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক শক্তিগুলোর উচিত হবে দ্রুত এই উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়া।
উপসংহারে বলা যায়, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সামরিক ক্ষমতার ব্যবধান যতই বড় হোক না কেন, যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়। মানবিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনায় দুই দেশকেই সংলাপ ও কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে। সামরিক শক্তির প্রদর্শন যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, এক ফোঁটা রক্তের চেয়ে কোনো অস্ত্রের মূল্য বেশি হতে পারে না।