
এ যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কোনো দৃশ্য! কল্পনার মতোই মনে হয়—বিদ্যুৎ যাচ্ছে বহু দূরে, কিন্তু কোনো তার নেই, নেই বিদ্যুতের খুঁটি, নেই বিদ্যুৎলাইনের গিঞ্জি। আর সেই বিদ্যুৎ গিয়ে আলো জ্বালাচ্ছে, যন্ত্র চালাচ্ছে, এমনকি তৈরি করছে পপকর্ন পর্যন্ত! ভাবা যায়? ভাবনাটিকে বাস্তব করে দেখিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডারপা (DARPA)।
২০২৫ সালের মে মাসে ডারপার এক অভূতপূর্ব সফলতা চমকে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে তারবিহীনভাবে বিদ্যুৎ প্রেরণ করে তারা মানব সভ্যতার প্রযুক্তির ইতিহাসে যুক্ত করেছে এক নতুন অধ্যায়। এটিই বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদূরত্বে সফলভাবে বিদ্যুৎ পাঠানোর ঘটনা, যার মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে ভবিষ্যতের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
এই সফলতার মাধ্যমে নতুন করে ভাবা যাচ্ছে, কেমন হতে পারে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি, কেমন হতে পারে দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ, কিংবা কিভাবে মহাকাশ স্টেশনে বা যুদ্ধে মোতায়েন সামরিক ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে—তাও আবার তার ছাড়াই!
প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত রহস্য
ডারপার এই প্রকল্পটির নাম POWER Program, যার পূর্ণরূপ হলো Persistent Optical Wireless Energy Relay। এই প্রযুক্তি মূলত দুটি ধাপে কাজ করে—প্রথমত, লেজার বিমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়, দ্বিতীয়ত, লক্ষ্যবস্তুতে সেই লেজারকে আবার বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়।
প্রক্রিয়াটি এতটাই নিখুঁতভাবে কাজ করে যে তারা ৮.৬ কিমি দূরে সফলভাবে ৮০০ ওয়াটের বেশি শক্তি পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। এই শক্তি দিয়ে শুধু বৈদ্যুতিক উপকরণ চালানোই নয়, পরীক্ষার অংশ হিসেবে তারা দূরবর্তী স্থানে পপকর্নও তৈরি করেছেন, যা ছিল একধরনের প্রতীকী প্রদর্শন—প্রযুক্তির কার্যকারিতার প্রমাণস্বরূপ।
লেজার রূপে বিদ্যুৎ পাঠানো হলেও এই লেজার সাধারণ আলো নয়। এটি অত্যন্ত উচ্চশক্তির, নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এবং খুবই নিখুঁতভাবে পরিচালিত। এই বিম যখন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে, তখন সেখানে থাকা ফটোভোল্টেইক (Photovoltaic) সেল এই লেজার আলোকশক্তিকে আবার বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে।
নিকোলা টেসলার শতাব্দীপ্রাচীন স্বপ্ন
এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—এর পেছনে রয়েছে নিকোলা টেসলা-র একশ বছরের পুরনো স্বপ্ন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিজ্ঞানী টেসলা প্রথমবারের মতো কল্পনা করেছিলেন তারবিহীন বিদ্যুৎ প্রেরণের। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি বিশ্ব, যেখানে বাতাস দিয়েই বিদ্যুৎ যাবে, ঠিক যেমন বেতার তরঙ্গ দিয়ে আজ আমরা তথ্য পাঠাই।
তবে সেই সময়ে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অপ্রতুলতা ও তৎকালীন সমাজব্যবস্থার অনীহার কারণে টেসলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়নি। কিন্তু আজ, ডারপার POWER প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর সেই অধরা কল্পনা একবিংশ শতাব্দীতে বাস্তবের রূপ পেল।
সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডারপার এই সাফল্য কেবল বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব নয়, বরং এর ভবিষ্যৎ প্রভাব হবে বিপ্লবী।
১. স্মার্ট সিটির বিদ্যুৎ: তার বিহীন প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের প্রতিটি কোণে সহজেই বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে, যেখানে অবকাঠামো তৈরির ঝামেলা নেই।
২. দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যুৎ: পাহাড়ি এলাকা, মরুভূমি কিংবা দ্বীপসমূহে তার টেনে বিদ্যুৎ নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এই প্রযুক্তি সেখানে নতুন সমাধান দিতে পারে।
৩. মহাকাশ ও সামরিক প্রয়োগ: মহাকাশযানে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে চটজলদি বিদ্যুৎ পৌঁছানো জরুরি। সেইখানে তারের ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব হলেও, লেজার-নির্ভর বিদ্যুৎ প্রযুক্তি সহজেই এই সমস্যা সমাধান করতে পারে।
৪. পরিবেশ বান্ধব: তার কাটাকাটি, মাটি খুঁড়ে লাইন বসানো, বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন লস ইত্যাদি বিষয় থেকেও এই প্রযুক্তি মুক্ত। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগতভাবে অধিকতর সহনশীল।
সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
তবে এই প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা। কারণ, এই উচ্চশক্তির লেজার যদি ভুলভাবে পরিচালিত হয় বা ভুল জায়গায় পৌঁছায়, তাহলে তা হতে পারে মারাত্মক ক্ষতিকর। মানুষ, পশু বা বস্তু—যেকোনো কিছুতেই এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তাছাড়া, বৃষ্টিপাত, কুয়াশা, ধুলা বা বায়ুমণ্ডলীয় নানা পরিবর্তন লেজারের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। অতএব, এটি ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন উন্নত গাইডিং সিস্টেম, অটোমেটেড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি, এবং শক্ত নিরাপত্তা প্রটোকল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে যদি এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব জ্বালানী খাতে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
ডারপার এই অর্জন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এটি শুধু প্রযুক্তির নয়, মানবসৃষ্টির সম্ভাবনারও জয়গান। ভবিষ্যতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এটি এনে দিতে পারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন সম্ভাবনা।
একদিন হয়তো বিদ্যুৎ যাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে—তার ছাড়াই। এক মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হবে শক্তি—লেজারের মাধ্যমে। হয়তো কোনো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় আকাশ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ পাঠানো যাবে।
আজ যা পরীক্ষামূলক—আগামীকাল তা হয়ে উঠতে পারে নিয়মিত, দৈনন্দিন বাস্তবতা। আর সেই দিন হয়তো খুব দূরে নয়। ডারপার এই সাফল্য কেবল এক প্রকল্পের সমাপ্তি নয়, বরং এক নবযুগের সূচনা।
ঠিক যেমন টেসলা একদিন কল্পনা করেছিলেন—বাতাস দিয়ে বিদ্যুৎ যাবে—তেমনি আজকের বিজ্ঞান সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এখন শুধু দরকার—উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, এবং সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করার কার্যকর পথ খুঁজে বের করা।
বিদ্যুতের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে—এবার তার ছাড়াই।