ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ

তাপের কাছে হারছে অ্যান্টিবায়োটিক

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৭ জুন ২০২৬, ৩:৫৮ বিকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন আর কেবল মেরু অঞ্চলের বরফ গলা বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দূরবর্তী সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, এই উষ্ণায়ন এখন সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ওপর মরণকামড় বসিয়েছে। এটি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং আমাদের শরীরের ভেতরের কোষীয় এবং জীবাণুতাত্ত্বিক ভারসাম্যকেও ওলটপালট করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট মাইক্রোব এবং ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত গবেষণায় এমন প্রলয়ংকরী তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ওষুধ-প্রতিরোধী বা ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট’ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক অকেজো হওয়ার হার প্রায় ১০.৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এটি কেবল ওষুধের অকার্যকারিতা নয়, বরং তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের মস্তিষ্কের প্রোটিন কাঠামোকে বিকৃত করে স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় শরীরের কোষের প্রোটিন গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে লিভার ও অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি সাধন করছে।

গবেষণার সারসংক্ষেপ:
‘অ্যাসোসিয়েশন বিটুইন অ্যাম্বিয়েন্ট টেম্পারেচার অ্যান্ড অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: আ নেশনওয়াইড স্টাডি ইন চায়না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি চীনের ৩১টি প্রদেশে দীর্ঘমেয়াদী তথ্য বিশ্লেষণ এবং সুক্ষ্ম কোষীয় পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় টানা ৬ বছর (২০১৪-২০২০) ধরে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে সংগৃহীত কয়েক লাখ রোগীর ব্যাকটেরিয়াল স্টেইন এবং অ্যান্টিবায়োটিক সংবেদনশীলতার কয়েক কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশাল ডাটা সেট থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের রোগ নিরাময় ক্ষমতার একটি নিবিড় ও ভয়ংকর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাই-ডিং লিন এবং তার গবেষক দল। ড. লিন পরিবেশগত মহামারীবিদ্যার একজন বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন। তার এই গবেষণাটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে, যেখানে পরিবেশের তাপমাত্রাকে সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার মিউটেশনের প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তাপমাত্রা ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঘাতক সম্পর্ক:
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তাপমাত্রা এবং ওষুধের কার্যকারিতার মধ্যকার সরাসরি সম্পর্ক। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার হার গড়ে ১০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যত বাড়বে, আমাদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলো তত দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়বে। এটি ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ চিকিৎসা সংকটের আগাম সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে। এই চরম পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়া তাদের বিপাকীয় হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং অতি দ্রুত বংশবিস্তার করতে শুরু করে। এই দ্রুত প্রজনন প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে ঘনঘন পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটে। বিবর্তনের এই নিয়ম অনুযায়ী তারা আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ শনাক্ত করতে এবং তা প্রতিরোধ করার জন্য নিজেদের জিনে সুরক্ষা কবচ তৈরি করে ফেলে। ফলে যে ওষুধটি আগে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করত, তা একসময় অকেজো হয়ে পড়ে। এটি মানবসভ্যতাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে যেখানে আমাদের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও সাধারণ জীবাণুর কাছে হার মানবে।

কোষীয় কাঠামো ও মস্তিষ্কের ওপর তাপমাত্রার বিধ্বংসী আঘাত:
মানুষের শরীরের প্রতিটি জৈবিক কাজ নির্ভর করে প্রোটিনের সঠিক গঠনের ওপর। আমাদের কোষের ভেতরে প্রোটিনগুলো নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক ভাঁজে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়, তখন শরীরের কোষের ভেতর থাকা এই প্রোটিনগুলো তাদের নির্দিষ্ট ভাঁজ বা গঠন হারিয়ে ফেলে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রোটিন মিসফোল্ডিং’ বলা হয়। প্রোটিন যখন তার গঠন হারায়, তখন সেটি আর তার নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারে না। এর ফলে লিভার, অন্ত্র এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোষগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরের ঝুঁকি তৈরি করে। গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল মানুষের মস্তিষ্কের ওপর তাপমাত্রার প্রভাব।

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদী তাপপ্রবাহ মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রোটিন কাঠামোকে বিকৃত করে দেয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের স্মৃতিশক্তির ওপর। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক রোগের হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ ত্বরান্বিত হতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ঝুঁকি জীবনঘাতী হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

# তাপ বৃদ্ধিতে দ্রুত ওষুধ-প্রতিরোধী হচ্ছে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া
# তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারায় ১০.৭%
# প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে জীবাণু দ্রুত মিউটেশন ঘটাচ্ছে
# জীবাণুর বিবর্তনে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অজেয় শক্তি হারিয়ে ফেলছে
# তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের মস্তিষ্কের প্রোটিন কাঠামো বিকৃত করে দিচ্ছে
# উচ্চ তাপমাত্রায় মানুষের স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে
# প্রোটিন মিসফোল্ডিংয়ের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে
# তপ্ত আবহাওয়া মানুষের শরীরকে জীবাণুর অভয়ারণ্যে পরিণত করছে

‘পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক’ যুগের হাতছানি
গবেষণার সামগ্রিক ফলাফল আমাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করছে, যাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ‘পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক এরা’ বলে অভিহিত করছেন। এর মানে হলো, আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে সংক্রমণের জন্য আমাদের কাছে কোনো কার্যকর ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক থাকবে না। এর ফলে সাধারণ ইনফেকশন, যেমন—সামান্য টাইফয়েড, নিউমোনিয়া বা একটি ছোট অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। কারণ, সংক্রমণ ছড়ানো ব্যাকটেরিয়াগুলো ততদিনে আধুনিক সব শক্তিশালী ওষুধের বিরুদ্ধে অভেদ্য সুরক্ষা কবচ তৈরি করে ফেলবে। সামান্য একটি হাত কেটে যাওয়া বা সাধারণ সর্দি-জ্বর থেকেও মানুষের মৃত্যু হতে পারে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগের যুগে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন এটি একটি ‘টাইম-বোম’:
চলতি বছরের মে মাসের বর্তমান তীব্র তাপপ্রবাহ এবং উচ্চ আর্দ্রতা দেশের জন্য এই গবেষণাকে একটি ‘রেড অ্যালার্ট’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদেশের আবহাওয়া এখন আর ‘স্বাভাবিক’ ঋতুচক্রের ধারায় নেই। ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহ টানা ৩৫ দিনের রেকর্ড গড়েছে এবং চলতি বছর সেই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের শীর্ষে অবস্থান করছে। এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রার সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ আর্দ্রতা, যা মানুষের শরীরকে একেকটি জীবন্ত গবেষণাগারে পরিণত করেছে।

অজেয় জীবাণুর অভয়ারণ্য: দেশের উচ্চ আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার মিউটেশনের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে টাইফয়েড, নিউমোনিয়া বা সাধারণ ডায়রিয়ার জীবাণুগুলো এখন আর প্রচলিত সিপ্রোফ্লক্সাসিন বা সেফালোস্পোরিন জাতীয় ওষুধে মরছে না। চিকিৎসকরা দেখছেন, রোগীদের সুস্থ হতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে এবং ওষুধের ডোজ বাড়াতে হচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার: সিজারিয়ান সেকশন থেকে শুরু করে বড় কোনো জটিল অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন ঠেকানো ভবিষ্যতে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে হাসপাতালের পরিবেশে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার আবার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বাড়বে চিকিৎসা ব্যয়: সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় রোগীদের অত্যন্ত উচ্চমূল্যের ‘লাস্ট-রিসোর্ট’ অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। এই ওষুধগুলোর দাম সাধারণ ওষুধের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, যা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এটি দেশের জিডিপি এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করছে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা: পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং ‘নাইট-টাইম হিটওয়েভ’-এর ফলে মানুষের মধ্যে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কাজের প্রতি অনীহা ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যা প্রকট হচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না নামায় মানুষের হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের বক্তব্য:
প্রধান গবেষক ড. হাই-ডিং লিন বলেন, গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই হলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান অস্ত্র অ্যান্টিবায়োটিক ১০ শতাংশের বেশি অকেজো হয়ে পড়া। আমরা যদি এখনই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে।

সহ-গবেষক ও অণুজীববিজ্ঞানী ড. সান ইয়াং সতর্ক করে বলেছেন যে, উচ্চ তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে টিকে থাকার লড়াইয়ে জীবাণুগুলো আরও হিংস্র ও ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ব্যাকটেরিয়াগুলো এমন কিছু প্রোটিন তৈরি করছে যা অ্যান্টিবায়োটিককে কোষের ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছে না। এটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এক মহাবিপদ।

বিএমডির জ্যেষ্ঠ আবহওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশ এখন আর স্বাভাবিক মৌসুমি জলবায়ুর ধারায় নেই; আমরা এক চরম অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছি। ২০২৪ সাল থেকে আমরা যে দীর্ঘমেয়াদী এবং আর্দ্র তাপপ্রবাহ দেখছি, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এই উচ্চ তাপমাত্রা শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক অধ্যাপক ড. সায়েবা আক্তার বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স দেশে এমনিতেই একটি বড় সমস্যা ছিল যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে। তার ওপর এই রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা আমাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এখনই হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর জাতীয় নীতিমালা ও আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, নাতিশীতোষ্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি বদলে গিয়ে এখন চরমভাবাপন্ন দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও দূষণের ফলে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তার প্রভাব পড়ছে অণুজীবের ওপরও। চীনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নিরীহ ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া এখন শক্তিশালী ও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, যার বিরুদ্ধে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এই ভয়াবহ ভবিষ্যৎ মোকাবিলায় আমাদের একদিকে যেমন উষ্ণায়ন রোধে ভূমিকা রাখতে হবে, অন্যদিকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক দুর্যোগের আগেই আমরা স্থানীয়ভাবে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটে পড়ব।

গবেষকদের জরুরি সুপারিশ:
জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেছেন। প্রথমত, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। সর্দি-জ্বরে অহেতুক অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে ব্যাকটেরিয়ার জিনগত পরিবর্তনের ওপর নিয়মিত বৈজ্ঞানিক নজরদারি ও গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, আবাসন পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে ঘরবাড়িতে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, শহরাঞ্চলে গাছ লাগানো এবং জলাশয় রক্ষা করতে হবে। পঞ্চমত, ব্যক্তিগত স্তরে সচেতন হয়ে তীব্র রোদে কাজ করা এড়িয়ে চলতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। চিকিৎসকদেরও নতুন মিউটেশন হওয়া ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে আপডেট তথ্য প্রদান করতে হবে। সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবি আরও জোরালোভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Front-of-Package Labelling to Warn About Ultra-Processed Food Risks

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

কানাডার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

লঘুচাপের প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি, এরপর আরও বাড়বে বর্ষণ

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

vivo Y500 Goes on Sale with Exclusive Offers

আকর্ষণীয় অফারের সাথে যাত্রা শুরু করলো ভিভো ওয়াই৫০০

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা