ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. মতামত

জলবায়ু সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ: তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ি, টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৬ জুন ২০২৬, ১২:০৮ বিকাল

Link Copied!

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় বিশ্বব্যাপী মানব অস্তিত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে সামনে রেখে এবারের দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন উৎস নিয়ে আলোচনা হলেও তামাক শিল্পের পরিবেশগত ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ তামাক চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন এবং ব্যবহার—প্রতিটি ধাপই পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ কেবল জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

তামাক: একটি পরিবেশগত সংকট

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বনভূমি তামাক চাষ ও তামাক পাতা শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। তামাক উৎপাদনে ব্যাপক পরিমাণে রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং পানি ব্যবহৃত হয়, যা মাটি ও জলসম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য অঞ্চলের কিছু এলাকায় তামাক চাষের বিস্তার কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের আশায় তামাক চাষে ঝুঁকলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির বোঝা পুরো সমাজকে বহন করতে হয়।

তামাক বর্জ্য: পরিবেশ দূষণের নীরব উৎস

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিত্যক্ত বর্জ্যের মধ্যে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ অন্যতম। সিগারেটের ফিল্টারে থাকা প্লাস্টিকজাত উপাদান সহজে পচে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে যায়। এগুলো নদী, খাল, সমুদ্র এবং নগর পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন কেন্দ্র এবং জনসমাগমস্থলে ছড়িয়ে থাকা সিগারেটের অবশিষ্টাংশ শুধু নান্দনিক পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং মাটি ও পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়ায়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব রাসায়নিক জলাশয়ে প্রবেশ করে জলজ প্রাণীর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও তামাকজাত পণ্য

তামাকজাত পণ্যের সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপকরণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় যখন বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং টেকসই কৃষির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন তামাক চাষ ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার হ্রাস করা একটি কার্যকর পরিবেশগত পদক্ষেপ হতে পারে।
বাংলাদেশে তামাকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংখ্য অসংক্রামক রোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হলো তামাক ব্যবহার।
তামাকজনিত অসুস্থতার কারণে পরিবারগুলোকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে তামাক চাষের জন্য ব্যবহৃত জমি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারত।

তামাক নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশ সুরক্ষার একটি কার্যকর কৌশল

বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্য অর্জন পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

তামাক নিয়ন্ত্রণে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ—

১. তামাক চাষ থেকে বিকল্প ফসলের দিকে রূপান্তর: কৃষকদের জন্য লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ফসল চাষে সহায়তা প্রদান।
২. তামাকজাত পণ্যের ওপর কার্যকর কর বৃদ্ধি: তামাকের ব্যবহার কমাতে মূল্য ও কর নীতিকে আরও শক্তিশালী করা।
৩. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: তামাকের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়েও সচেতনতা তৈরি করা।
৪. ধূমপানমুক্ত জনপরিসর নিশ্চিত করা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং গণপরিবহনে আইন বাস্তবায়ন জোরদার করা।
৫. সিগারেট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পরিবেশ দূষণের একটি উৎস হিসেবে বিবেচনা করে উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা।

তরুণদের ভূমিকা

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, পরিবেশ ক্লাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণরা তামাকমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, একটি সুস্থ পরিবেশ, নিরাপদ জলবায়ু এবং স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনের জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। তামাকমুক্ত পরিবেশ শুধু রোগমুক্ত জীবনই নিশ্চিত করবে না; এটি বন, মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সুরক্ষা দেবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—“তামাকমুক্ত পরিবেশ, জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ।” আমরা পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

লেখক: মোয়াজ্জেম হোসেন টিপু, উন্নয়নকর্মী ও কর্মসূচি সমন্বয়কারী, ডেভলপমেন্ট এ্যাকটি্ভিটিস অফ সোসাইটি (ডাস্)।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Front-of-Package Labelling to Warn About Ultra-Processed Food Risks

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

কানাডার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

লঘুচাপের প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি, এরপর আরও বাড়বে বর্ষণ

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

vivo Y500 Goes on Sale with Exclusive Offers

আকর্ষণীয় অফারের সাথে যাত্রা শুরু করলো ভিভো ওয়াই৫০০

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা