
একটি সময় ছিল, যখন নবজাতকের কান্না ছিল একটি জাতির উত্থানের প্রতীক। যখন শিশুর জন্মসংখ্যা শুধু পরিবার নয়, গোটা সমাজের ভবিষ্যতের কথা বলে দিত। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত মানবসভ্যতা অনেক দূর এগিয়েছে—অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনের গড় আয়ু—সবই উন্নত হয়েছে। কিন্তু এই উন্নতির মাঝে কিছু মৌলিক পরিবর্তনও এসেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো জন্মহার বা Birth Rate-এর নাটকীয় পরিবর্তন। আজকের এই তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণে আমরা দেখব, বিগত ছয় দশকে বিশ্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্মহার কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং এই পরিবর্তনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত তাৎপর্য কী।
১৯৬০ সালে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মহার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ছিল একদম শীর্ষে—প্রতি ১,০০০ জনে ৪২.৫টি শিশুর জন্ম হত, যা ছিল একটি চরম জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ইঙ্গিত। একই সময়ে কানাডা (২৬.৭), যুক্তরাষ্ট্র (২৪), চীন (২০.৮), ফ্রান্স (১৮.৭), ইতালি (১৮.১), যুক্তরাজ্য (১৭.৫), জার্মানি (১৭.৩) এবং জাপান (১৭.২) এইসব দেশের জন্মহারও ছিল উচ্চমাত্রায়। এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্ব জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির একটি বড় ধাক্কা সৃষ্টি করেছিল, যার প্রভাব পড়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামোতে।
তবে ২০২১ সালের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে ১৯৬০ সালে ভারতের জন্মহার ছিল ৪২.৫, সেখানে ২০২১ সালে তা নেমে এসেছে ১৬.৪-এ। প্রায় ৬০% হ্রাস পাওয়া এই হার ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ নীতির এক বড় সাফল্য হিসেবে ধরা যায়। একইভাবে কানাডার জন্মহার কমেছে ২৬.৭ থেকে ৯.৬-এ, যুক্তরাষ্ট্র ২৪ থেকে ১১-এ, চীন ২০.৮ থেকে ৭.৫-এ, ফ্রান্স ১৮.৭ থেকে ১০.৯-এ, ইতালি ১৮.১ থেকে ৬.৮-এ, যুক্তরাজ্য ১৭.৫ থেকে ১০.১-এ, জার্মানি ১৭.৩ থেকে ৯.৬-এ, এবং জাপান ১৭.২ থেকে ৬.৬-এ নেমে এসেছে।
এই নাটকীয় পতনের পিছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কারণ। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে শিশুমৃত্যু হার কমেছে, ফলে পরিবারগুলো আর আগের মতো অনেক সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না। দ্বিতীয়ত, নারীশিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রসার, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, নারীদের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে আরও সুপরিকল্পিত করেছে। তৃতীয়ত, জন্মনিয়ন্ত্রণের সহজলভ্যতা এবং জনসচেতনতা বাড়ার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তান সংখ্যা সীমিত রাখার প্রবণতা বেড়েছে।
আবার, উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উচ্চ শিক্ষালাভ, বাড়তি জীবনযাপন ব্যয় এবং কর্মজীবনের ব্যস্ততা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিলম্বিত বা বাতিল করছে। যেমন, ইতালি, জাপান, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এখন এতটাই কম জন্মহারে পৌঁছেছে যে তাদের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং বার্ধক্য সমাজে পরিণত হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে সেসব দেশে শ্রমশক্তির ঘাটতি, পেনশন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
চীনের ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া “এক সন্তান নীতি” দীর্ঘদিন ধরে জন্মহারকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। যদিও এই নীতি এখন শিথিল করা হয়েছে এবং তিন সন্তানের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে, তবুও শহুরে জীবনযাত্রার খরচ ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে চীনারা আর বড় পরিবার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে জন্মহার হ্রাস অব্যাহত রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম এবং নারীদের মধ্যে স্বাস্থ্যশিক্ষার বিস্তার জন্মহার কমাতে সহায়তা করেছে। তবে ভারতে এখনো গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে জন্মহারের পার্থক্য রয়ে গেছে। শহরে জীবনযাত্রার খরচ এবং কর্মমুখী জীবনের কারণে পরিবার ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু গ্রামে এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তানের প্রবণতা আছে, যদিও তা আগের চেয়ে অনেকটাই কম।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে—জন্মহার হ্রাস কি আদৌ ভালো? এর উত্তর নির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জনসংখ্যার বয়স গঠন এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনার ওপর। একটি সীমিত জন্মহার দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, কিন্তু যদি তা প্রয়োজনের চেয়েও নিচে নেমে যায়, তাহলে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাপান বা ইতালির মতো দেশে শিশুদের অভাবের কারণে স্কুল বন্ধ হচ্ছে, বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকছে এবং অর্থনীতিতে “কাজের মানুষের” অভাব দেখা দিচ্ছে।
অপরদিকে, জন্মহার বেশি হলে যেমন জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটে, তেমনি একটি দেশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং বাসস্থান খাতে। ফলে আদর্শ জন্মহার হলো এমন একটি হার, যেখানে একটি প্রজন্ম নিজেকে ধরে রাখতে পারে—অর্থাৎ “Replacement Fertility Rate”, যা সাধারণত প্রতি নারী ২.১ সন্তানের সমান।
বিশ্ব এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আলাদা আলাদা কৌশলে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে পরিবারবান্ধব নীতিমালা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশু পরিচর্যা সুবিধা ও কর ছাড়ের মাধ্যমে তরুণ দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, জন্মহার কোনো স্থির সূচক নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার প্রতিফলন। এর সঙ্গে যুক্ত আছে সমাজের মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষা ও জীবনযাপনের ধরণ। বিগত ছয় দশকে বিশ্বের জন্মহার পরিবর্তনের চিত্র আমাদের সামনে একটি বড় বার্তা দেয়—নতুন জীবনের আগমন শুধু সংখ্যার বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অস্তিত্ব, ভবিষ্যৎ এবং রূপান্তরের সূচক।
তাই, জন্মহার হ্রাস বা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আমাদের শুধু একটি সংখ্যা বলে না; এটি বলে দেয়, আমরা কোন পথে হাঁটছি, আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে, এবং আমাদের পরিকল্পনাগুলো কতটা টেকসই হচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রবাহে যেসব দেশ কৌশলী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তারাই আগামীদিনে জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের অন্যতম মডেল হয়ে উঠবে।