ঢাকারবিবার , ৭ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ সড়ক
  3. লাইফস্টাইল

চলমান গতি অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দ্রুততম ট্রেন

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৮ অপরাহ্ণ

Link Copied!

রাতের আঁধারে জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায় ঝলমলে আলো যেন এক সরলরেখায় ছুটে যাচ্ছে দূরে। শহরের ভেতর দিয়ে গর্জে ওঠা সেই শব্দ, ট্র্যাকের উপর দিয়ে ছুটে চলা ধাতব দানবের মতো শক্তিশালী অথচ শৃঙ্খলাবদ্ধ এক যন্ত্র—এটাই আধুনিক রেলের সৌন্দর্য। মানুষ যখন প্রথম চাকার গতি আবিষ্কার করেছিল, তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি যে একদিন ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি বেগে মাটির উপর দিয়েই তারা উড়তে বসবে। বিমানের বিকল্প নয়, বরং স্থলভাগের দ্রুততম পরিবহন মাধ্যম হিসেবে আজকের উচ্চগতির ট্রেন বিশ্বের নানা দেশে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

রেলপথে চলাচলকারী এই ট্রেনগুলো কেবল যাত্রী পরিবহন নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক সমৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে আর মানুষের ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক করতে এই দ্রুতগামী ট্রেন উন্নয়ন করছে। আর ২০২৩ সালের Railway Technology–এর তথ্যমতে, বিশ্বের দ্রুততম ১০টি ট্রেনের তালিকা আমাদের সামনে উন্মোচন করে দেয় এক চমকপ্রদ চিত্র।

সাংহাই ম্যাগলেভ: চৌম্বক শক্তির মায়াবি দৌড়
চীনের সাংহাই শহরে ম্যাগলেভ ট্রেনের যাত্রা শুরু যেন বিজ্ঞানের কল্পকাহিনির বাস্তব রূপ। ২০০৪ সালে চালু হওয়া এই ট্রেন প্রতিদিন বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত হাজারো মানুষকে বহন করে। এর গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৬০ কিলোমিটার, যা এখনো বিশ্বের যেকোনো বাণিজ্যিক ট্রেনের তুলনায় দ্রুততম। এর রহস্য চৌম্বক শক্তি—রেলের ট্র্যাকের উপর দিয়ে চাকা ছাড়াই ভেসে চলে এটি। ফলে ঘর্ষণ কমে যায়, গতি বাড়ে এবং যাত্রীরা পান এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

হারমোনি সিরিজ: চীনের স্থলযাত্রার বিপ্লব
চীনের আরেক বিস্ময় হলো CR Harmony। সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোমিটার গতির এই ট্রেন দেশটির দ্রুততম প্রচলিত চাকার উপর ভিত্তিক ট্রেন। বিশাল চীনা ভূখণ্ডে রাজধানী বেইজিং থেকে সাংহাই কিংবা গুয়াংজুতে পৌঁছানোর সময় কমিয়ে দিয়েছে এই ট্রেন। ব্যবসা, পর্যটন, এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য।

ফুসিং হাও: আধুনিকতার প্রতীক
চীনের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম CR Fuxing। “পুনর্জাগরণ” নামের এই ট্রেনেরও সর্বোচ্চ গতি ৩৫০ কিলোমিটার। শুধু গতি নয়, আরাম ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি বিশ্বমানের। বড়সড় কামরা, আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কাঠামো একে করেছে চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড।

জার্মানির ICE 3: প্রকৌশলের নিখুঁত উদাহরণ
জার্মান প্রযুক্তি মানেই নির্ভুলতা আর দক্ষতা। ডয়চে বান (DB)–এর Intercity-Express 3 বা ICE 3 ট্রেন ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলে। ইউরোপ জুড়ে আন্তঃদেশীয় ভ্রমণে এই ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে প্যারিস কিংবা ব্রাসেলস—ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভ্রমণকারীদের কাছে এটি যেন সময় বাঁচানোর এক জাদুকাঠি।

ফ্রান্সের TGV: ইউরোপীয় গর্ব
১৯৮১ সালে চালু হওয়া ফ্রান্সের TGV ইউরোপীয় উচ্চগতির ট্রেনের ইতিহাসের সূচনা করে। আজও এটি ৩২০ কিলোমিটার গতিতে ফ্রান্সের শহরগুলো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্ত করছে। একসময় এটি পরীক্ষামূলকভাবে ঘণ্টায় ৫৭৪ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলেছিল, যা আজও বিশ্বের দ্রুততম রেকর্ডগুলোর একটি। ফরাসি সমাজে এর গুরুত্ব এতটাই গভীর যে TGV এখন সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

জাপানের শিনকানসেন: নির্ভুলতা ও নিরাপত্তার মডেল
বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক উচ্চগতির ট্রেন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল জাপানে, ১৯৬৪ সালে। টোকিও অলিম্পিককে ঘিরে শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা। আজকের Shinkansen ট্রেন ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলে, এবং এটি বিশ্বে সবচেয়ে সময়নিষ্ঠ ট্রেন হিসেবে খ্যাত। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সময় মেনে চলা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানে এই ট্রেনকে নিরাপদ রাখার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবস্থা, যা যাত্রীদের আস্থাকে করেছে আরও দৃঢ়।

মরক্কোর আল বোরাক: আফ্রিকার গর্ব
আফ্রিকা মহাদেশে উচ্চগতির রেলের সূচনা করে মরক্কোর Al Boraq। ২০১৮ সালে ফরাসি প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি এই ট্রেন সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে। তাঞ্জিয়ের থেকে কাসাব্লাঙ্কা পর্যন্ত যাত্রার সময় অর্ধেকে নামিয়ে এনে এটি মরক্কোর অর্থনীতি ও সমাজে এক নতুন গতি সঞ্চার করেছে।

স্পেনের AVE 103: দ্রুতগামী ইউরোপীয় সংযোগ
স্পেনের Renfe AVE 103 ট্রেন ঘণ্টায় ৩১০ কিলোমিটার গতিতে চলে। মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনা পর্যন্ত দীর্ঘ ভ্রমণকে এটি মাত্র আড়াই ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে। ইউরোপের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কে স্পেন অন্যতম অগ্রগামী দেশ, এবং এই ট্রেনই তার প্রধান ভিত্তি।

দক্ষিণ কোরিয়ার KTX-Sancheon: এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা
দক্ষিণ কোরিয়ার KTX-Sancheon ট্রেন সর্বোচ্চ ৩০৫ কিলোমিটার গতিতে সিউল থেকে বুসান কিংবা গওয়াংজুতে যাত্রী পরিবহন করে। কোরিয়ান প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্রেন দেশটির অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে বিপ্লব ঘটিয়েছে। শুধু তাই নয়, এটি এশিয়ার উচ্চগতির রেল প্রতিযোগিতায় চীন ও জাপানের সমকক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতালির ফ্রেচ্চিয়ারোসা 1000: ভূমধ্যসাগরের লাল তীর
ইতালির Frecciarossa 1000, অর্থাৎ “লাল তীর”, ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ায়। রোম থেকে মিলান কিংবা ফ্লোরেন্স—দেশের প্রধান শহরগুলোকে দ্রুততম সময়ে যুক্ত করছে এই ট্রেন। আধুনিক নকশা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং আরামদায়ক ভ্রমণের কারণে এটি ইউরোপীয় যাত্রীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

উচ্চগতির রেল: আধুনিক সভ্যতার প্রতীক
বিশ্বের এই দ্রুততম ১০টি ট্রেন কেবল প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির নিদর্শন। এগুলো মানুষের ভ্রমণ সময় কমাচ্ছে, বিমান পরিবহনের বিকল্প দিচ্ছে, জ্বালানি খরচ কমাচ্ছে এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হাজির করছে। বিশেষ করে চীন, জাপান ও ইউরোপে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংযোগ এবং সামাজিক পরিবর্তনে অপরিসীম অবদান রাখছে।

আজকের বিশ্বে যেখানে সময় অর্থের সমান, সেখানে এই দ্রুতগামী ট্রেনগুলো মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন হলে হয়তো আমরা ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার গতির ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করব। ততদিন পর্যন্ত সাংহাইয়ের ম্যাগলেভ থেকে শুরু করে ইউরোপের TGV কিংবা জাপানের শিনকানসেন—সবগুলোই মানবসভ্যতার এক অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রার সাক্ষী হয়ে থাকবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

খাদ্য প্যাকেটের সম্মুখভাগে সতর্কবার্তা বাড়াবে ভোক্তা সচেতনতা, কমাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৩৮ প্রাণহানি

ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ জরুরি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশে ফিরেছেন ৩৭ হাজার ৪৩৫ হাজী, হজ ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ

মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয়, ১১ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস

নড়াইলে পৃথক বজ্রপাতে কৃষকসহ নিহত ২

জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও কমছে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু বাজেট বরাদ্দ

নড়াইলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস উল্টে আহত ২০

কুমিল্লায় বাস-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩

কলাপাড়ায় বাস-ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৮

আজ থেকে নতুন সূচিতে চলবে মেট্রোরেল

এক বছর আগেই স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা