
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১০ লাখ খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে (ফুড বিজনেস অপারেটর) তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। একই সঙ্গে খাদ্য পণ্যের লেবেলিং ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভেজাল ও মানহীন খাদ্য নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক কর্মশালায় এ তথ্য জানানো হয়। এই কর্মশালার আয়োজন করেছে আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টর।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগরের প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার কাজ শুরু হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং একসঙ্গে সম্পন্ন করা যাবে। তালিকাভুক্তির মাধ্যমে প্রথমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। এরপর নিবন্ধন সম্পন্ন হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে একই তথ্য বারবার দিতে হবে না এবং পুরো প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানান, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা এ কাজে যুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর বা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ নিয়ে যে শঙ্কা রয়েছে, তা দূর করতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সেমিনার, চেম্বার অব কমার্স ও ব্যবসায়ী সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ভেজাল ও নকল খাদ্যের তথ্য দিতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, কোথাও ভেজাল বা নকল খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার তদারকিতে মোবাইল টেস্টিং ভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ভ্যানে প্রাথমিকভাবে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করা গেলেও চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, খাদ্য পরীক্ষার পুরো ব্যয় এখনও সরকার বহন করছে। কোনো পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরে পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানির ১০৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেছে সরকার। উন্নত দেশে খাদ্য মান লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে অভিযানের সময় নানা চাপ ও বাধার মুখে পড়তে হয়। তা সত্ত্বেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, এটি ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সততা ও দায়িত্বশীলতাও জরুরি।
কর্মশালায় খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) এখন বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে প্যাকেটজাত খাবারের পেছনে থাকা জটিল ‘নিউট্রিশন ফ্যাক্টস’ সাধারণ ভোক্তার জন্য বোঝা কঠিন হওয়ায় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিংকে একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এফওপিএল পদ্ধতিতে প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা বা চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, যাতে ভোক্তা দ্রুত বুঝতে পারেন কোন খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে।
বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে বিভিন্ন ধরনের এফওপিএল মডেল চালু রয়েছে। চিলি ও মেক্সিকোতে কালো অষ্টভুজাকৃতি সতর্কবার্তা, যুক্তরাজ্যে ট্রাফিক লাইট এবং ফ্রান্সে নিউট্রি-স্কোর পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। চিলিতে এ ব্যবস্থা চালুর পর চিনিযুক্ত পানীয় ও জাঙ্ক ফুডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশেও এফওপিএল চালুর জন্য একটি খসড়া বিধিমালা প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এতে উচ্চ চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্যাকেটের সামনের অংশে সতর্কীকরণ চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের জন্য চিলির মতো কালো অষ্টভুজাকৃতি সতর্কবার্তা মডেল সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, কারণ এটি সহজে বোঝা যায় এবং সকল শ্রেণির মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকর খাবার চিনতে পারেন।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন বিএসটিইএম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার মহুয়া, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এবং বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর রুহুল আমিন রুশদসহ গণমাধ্যম কর্মীরা।