ঢাকাসোমবার , ৬ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

অতিরিক্ত কাজের চাপ বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ৬, ২০২৬ ৫:৫৯ অপরাহ্ণ । ২ জন

বেশিরভাগ অফিসে দৈনিক আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অনেক কর্মী এর চেয়েও বেশি সময় কাজ করছেন। দীর্ঘসময় কাজ করার এই অভ্যাস অনেকের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে, যা ধীরে ধীরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত কাজের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১৬ সালে দীর্ঘসময় কাজের ফলে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

জাপানে দীর্ঘসময় কাজের কারণে মৃত্যুকে ‘কারোশি’ নামে অভিহিত করা হয়, যার অর্থ অতিরিক্ত কাজ করতে করতে মৃত্যু। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কারোশির কারণে ২৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘসময় কাজের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। সপ্তাহে ৩৫–৪০ ঘণ্টা কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের তুলনায় যারা ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, তাদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি।

এই গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘসময় কাজের কারণে মৃত্যুবরণকারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘদিন পর—কখনো কখনো এক দশক পরও—প্রকাশ পায়।

করোনাভাইরাস মহামারির পর বিশ্বজুড়ে দীর্ঘসময় কাজ করার প্রবণতা আরও বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার ফ্র্যাঙ্ক পেগা জানান, লকডাউনের সময় কর্মঘণ্টা গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল।

গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘসময় কাজ দুইভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। প্রথমত, অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীর ও মস্তিষ্কে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা অবসাদ, শারীরিক ব্যথা এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের জীবনযাপনে মানুষ ধূমপান, মদ্যপান, কম ঘুম, ব্যায়ামের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

প্রতিষ্ঠিত সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘসময় কাজের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং পেশীর বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।

ঢাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাহাত হোসেন বলেন, সপ্তাহে ৬০–৬৫ ঘণ্টা কাজ তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তিনি জানান, দীর্ঘসময় কাজের চাপ তাকে মানসিক অবসাদে নিয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাকে চাকরি পরিবর্তনে বাধ্য করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়োগদাতাদের কাজের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। ফ্র্যাঙ্ক পেগার মতে, কাজের সময় কমানো শুধু কর্মীদের স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও সহায়ক। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের সময় কাজের ঘণ্টা বাড়ানো কোনোভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মপরিবেশে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, যা কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি