ভোরের রাজশাহী। সূর্য ওঠে ঠিকই, কিন্তু তার আলো শহরের গলিপথে পৌঁছাতে পারে না। চারদিকে ঘন কুয়াশার আস্তরণ পড়ে আছে। মনে হয় গোটা শহর যেন সাদা চাদরে ঢাকা এক নিঃশব্দ জনপদ। এই শহরে শীত শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, শীত এখানে কষ্টের আরেক নাম।
নদীর পাড়ে, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা শহরের ফুটপাতে বা বস্তিতে কাঁপতে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়, শীত সবার জন্য সমান নয়। কারও কাছে শীত মানে উষ্ণ কম্বল, গরম চা আর অলস সকাল। আবার কারও কাছে শীত মানে সারারাত কাঁপুনি, ক্ষুধা আর অনিশ্চিত আগামী।

রাজশাহীতে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই জেঁকে বসেছে শীত। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির এই সময়টাতে শীতের তীব্রতা সর্বাধিক থাকে। এই সময়েই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন আর্থিকভাবে অসচ্ছল শ্রমজীবী মানুষরা।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, প্রথম দফার শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছিল গত ৩১ ডিসেম্বর। এরপর টানা চার দিন শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে গত শুক্রবার রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। পরে গতকাল রোববার তাপমাত্রা বেড়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে শৈত্যপ্রবাহ কিছুটা কমে আসে। ভোরের দিকে কুয়াশার মতো বৃষ্টি হলেও দুপুরে অল্প সময়ের জন্য সূর্যের দেখা মিলেছিল। তবে আজ সারা দিন রোদ ওঠেনি, চারপাশ ছিল ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক লতিফা হেলেন বলেন, গতকালের তুলনায় আজ তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী আজ আবার শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। সামনে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।
শীতের এই প্রকোপে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষরা। রাজশাহী রেলস্টেশনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো বৃদ্ধ মজিবর রহমান বলেন, দিনে যাই কাজ খুঁজি, রাতে এইখানেই থাকি। একটা পুরনো লুঙ্গি আর ছেঁড়া চাদরই আমার শীতবস্ত্র।

রাজশাহীতে শীত নামলেই সবচেয়ে বিপদে পড়েন দিনমজুর, রিকশাচালক, পথশিশু ও বৃদ্ধ মানুষরা। কুয়াশার কারণে সকালবেলা কাজে বের হতে দেরি হয়। এতে কাজের সময় কমে যায়, কমে যায় আয়ও। ফলে খেটে খাওয়া মানুষের দিনের শুরুটাই হয় লোকসান দিয়ে।

নগরের কাজলা এলাকায় রিকশা চালান বদর উদ্দিন। তিনি বলেন, যত দেরি করে বাড়ি থেকে বের হই, ততই আয় কমে। শীত হলো ধনীদের। গরিবের জন্য শুধু কষ্ট আর কষ্ট।
শীতের আরেক করুণ চিত্র দেখা যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে।নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। চিকিৎসকরা জানান, শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধ রোগী বেশি চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শহরের অভিজাত এলাকায় যখন হিটার আর গিজারের উষ্ণতা, তখন পদ্মার ধারে পঞ্চবটী এলাকার বস্তিগুলোতে শীত মোকাবিলার একমাত্র ভরসা খোলা আগুন। প্লাস্টিক আর কাঠকুটো জ্বালিয়ে ঠান্ডা দূর করার চেষ্টা চলে। সেই ধোঁয়া যেমন ক্ষতি করে শরীরের, তেমনি নিঃশব্দে ক্ষয় করে মানুষের জীবনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাও। অনেকেই অসাবধানতায় আগুনে পুড়ে আহত হন।
আগুন পোহাতে থাকা কামেলা বেগম বলেন, শীতে আগুন পোহাতে হলে কাপড় নোংরা হয়ে যায়। কিন্তু শীত তো আর কারও কথা শোনে না।
একই এলাকায় দেখা যায় বালু টানার কাজে ব্যস্ত কয়েকজন শ্রমিককে। কাঁপতে কাঁপতে কাজ করতে করতে একজন শ্রমিক বলে ওঠেন, বরফ পড়লেও কাজে আসতে হবে। তাছাড়া উপায় নেই।


