
মাটি ও পরিবেশকে রাসায়নিক দূষণ থেকে রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করছেন চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম। বংশ পরম্পরায় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই উচ্চশিক্ষিত তরুণ তার উৎপাদিত জৈব সার সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান।
চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে চলমান বৃক্ষমেলায় বাসসের সঙ্গে আলাপকালে ‘জান্নাতশপ.সিটিজি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম তার এ উদ্যোগের কথা জানান।
তাওয়াবুল ইসলাম বলেন, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এর প্রভাব মানুষ ও প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। তাই মাটি ও পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, ২০০৫ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি বাগান করা শুরু করেন। সে সময় ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সার কেনার সামর্থ্য না থাকায় রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, কিচেন কম্পোস্ট ও গোবর ব্যবহার করতেন। পরে এসব উপাদান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেন।
তাওয়াবুল বলেন, কাঁচা গোবর সরাসরি গাছে ব্যবহার করা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও গবেষণার পর বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি শুরু করেন তিনি।
তার তৈরি জৈব সারে রান্নাঘরের বর্জ্য ও শাকসবজির খোসা, ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার, পচা পাতা, ধানের তুষ, খড়, ডিমের খোসা, হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি, নিম খৈল, সরিষার খৈল ও গাছের ছালসহ প্রায় ১৫ ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। প্রতি কেজি জৈব সারের দাম ৪০ থেকে ৮০ টাকা। তার দাবি, গাছ লাগানোর সময় একবার এ সার প্রয়োগ করলে প্রায় চার মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।
তিনি বলেন, দেশের মাটি ও পরিবেশ রক্ষার চিন্তা থেকেই জৈব সার বাজারজাত করছেন। জৈব সার মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং এর প্রাকৃতিক উপাদানগুলো পরিবেশে মিশে গিয়ে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়।
সরকার মানুষকে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে আরও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করলে দেশে জৈব সার ব্যবহারে নতুন গতি তৈরি হবে বলেও মনে করেন তিনি।
তবে জৈব সার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, জৈব উপাদান সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করলে মাটির জৈব পদার্থ, পানি ধারণক্ষমতা, মাটির গঠন এবং উপকারী অণুজীবের কার্যক্রম বাড়তে পারে। তবে প্রাকৃতিক উপাদান মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ-এ ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তিনি বলেন, কাঁচা গোবর যথাযথভাবে পচানো ও পরিপক্ব না করে ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে হাড়, শিং, খৈল বা রান্নাঘরের বর্জ্য সঠিক অনুপাতে ব্যবহার না করলে মাটিতে অতিরিক্ত পুষ্টি জমতে পারে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস মাটির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাশয়ও দূষিত করতে পারে।
অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, জৈব সার ও রাসায়নিক সারকে শুধু ভালো বা খারাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক সারও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। মূল বিষয় হলো মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক সার, সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ে ব্যবহার করা।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সার কেনার সময় শুধু দাম বা গাছ কত দ্রুত বড় হবে তা বিবেচনা না করে মাটির জন্য সেটি কতটা নিরাপদ, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, প্রকৃতির অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে পুনরায় কৃষি ও উদ্ভিদ পরিচর্যার কাজে ব্যবহার করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধানের তুষ, গাছের পাতা-ছাল কিংবা পশুর হাড়-মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় হলেও প্রকৃতিতে এসব উপাদানের মূল্য রয়েছে। সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে এগুলো কৃষি ও উদ্ভিদ পরিচর্যার কাজে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
সঠিক প্রক্রিয়ায় জৈব সার উৎপাদন এবং মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিকভাবে তা ব্যবহার করা গেলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা ও টেকসই কৃষিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ দিক থেকে চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তার উদ্যোগ প্রাকৃতিক উপাদানের পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব উদ্ভিদ পরিচর্যায় নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে।