
সৌরজগতের প্রধান গ্রহাণু বেল্টে ঘুরে বেড়ানো দুটি বিশাল গ্রহাণুর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যেগুলোর ঘূর্ণন গতি সাধারণ কোনো মহাজাগতিক বস্তুর মতো নয়—বরং পার্কের মেলায় থাকা রোমাঞ্চকর ঘূর্ণি রাইডের মতোই অত্যন্ত দ্রুত। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট-এ জোসেফ ও ‘কালাঘানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার কেবল আশ্চর্যজনকই নয়, বরং সৌরজগতের গ্রহাণুগুলোর গঠন, এদের ভেতরের শক্তি এবং পৃথিবীর সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
মহাকাশবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, গ্রহাণু যখন নির্দিষ্ট আকৃতির চেয়ে বড় হয়, তখন সেটির ঘূর্ণন গতির একটি ‘প্রাকৃতিক সীমা’ থাকে। সাধারণত বড় আকারের গ্রহাণুগুলো কোনো নিরেট একখণ্ড পাথর দিয়ে তৈরি নয়; এগুলো মূলত ধূলিকণা, ছোট-বড় পাথর ও মহাজাগতিক বর্জ্যের এক ধরনের আলগা স্তূপ, যা ক্ষীণ মাধ্যাকর্ষণ বলের মাধ্যমে একসঙ্গে টিকে থাকে।
বিজ্ঞানীদের গণনা অনুযায়ী, কোনো আলগা পাথরের স্তূপাকার গ্রহাণু যদি খুব দ্রুত নিজ অক্ষে পাক খেতে শুরু করে, তবে অতিরিক্ত কেন্দ্রবিমুখী বলের প্রভাবে সেটি ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত এই বিশাল গ্রহাণু দুটি তাদের নিজস্ব ভর ও আকৃতির তুলনায় এত উচ্চ গতিতে ঘুরছে যা তাত্ত্বিক গণনার সব সীমা অতিক্রম করে গেছে।
কেবল এই দুটি বৃহৎ গ্রহাণুই নয়, গবেষকরা এই অনুসন্ধানে আরও অন্তত ১৮টি গ্রহাণু চিহ্নিত করেছেন, যেগুলোর ঘূর্ণন গতি বর্তমান বিজ্ঞানের চোখে ‘অসম্ভব’ বা অসম্ভব রকমের দ্রুত।
এই অস্বাভাবিক আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যে, এত তীব্র গতিতে ঘোরার পরও কেন এই গ্রহাণুগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে না?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে দুটি। প্রথমত, এতদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বৃহৎ গ্রহাণুগুলোকে যেভাবে নিছক ‘পাথরের আলগা স্তূপ’ বলে মনে করতেন, এগুলোর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্ভবত তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও জটিল। এগুলোর ভেতরে এমন কোনো রাসায়নিক বা ভৌগোলিক উপাদান রয়েছে যা অত্যন্ত তীব্র ঘূর্ণন বল সত্ত্বেও পুরো কাঠামোটিকে একটি শক্ত বাঁধনে ধরে রাখছে। দ্বিতীয়টি হতে পারে গ্রহাণুগুলোর উপরিভাগের খনিজ উপাদান এবং ভেতরের ঘর্ষণ বল এমন এক শক্তি তৈরি করে, যা কেন্দ্রবিমুখী বলকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এই অতি-দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণুগুলোর আবিষ্কার কেবল একক কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের সৌরজগতের প্রাথমিক ইতিহাস ও বিবর্তন সম্পর্কে আমরা এখনও অনেক কিছু জানি না।
সৌরজগৎ সৃষ্টির সূচনালগ্নে কীভাবে ধূলিকণা ও পাথর একত্রিত হয়ে গ্রহ ও গ্রহাণুতে পরিণত হয়েছিল—তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা যেসব কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন, সেগুলোতে নতুন এই ঘূর্ণন গতি ও উপাদানের শক্তি সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যতে নাসা’র ‘লুসি’ মিশন এবং নির্মাণাধীন ‘ভেরা সি. রুবিন পর্যবেক্ষণাগার’ -এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ডাটা গ্রহাণুর এই অজানা রহস্য সমাধানে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে পৃথিবীর সুরক্ষার (প্ল্যানেটারি ডিফেন্স) ক্ষেত্রে। ভবিষ্যতে যদি কোনো বিশালাকার গ্রহাণু পৃথিবীর অভিমুখে ধেয়ে আসে, তবে সেটিকে ধ্বংস করা বা সেটির গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য মানবজাতিকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
নাসার ‘ডার্ট’ মিশনের মতো অভিযানের মূল লক্ষ্যই ছিল কোনো গ্রহাণুতে মহাকাশযান দিয়ে আঘাত করে তার গতিপথ বদলে দেওয়া। কিন্তু কোনো গ্রহাণু যদি নিরেট পাথরের স্তূপ না হয়ে অত্যন্ত শক্ত ও দ্রুত ঘূর্ণায়মান এক কাঠামো হয়, তবে তাতে আঘাত করার ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রহাণু কীভাবে ঘোরে এবং এর কোন স্থানে আঘাত করলে গতিপথ সবচেয়ে ভালোভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব-তা নির্ভুলভাবে জানার জন্য এই অতি-দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণুগুলোর গবেষণা মহাকাশসংস্থাগুলোকে এক অমূল্য হাতিয়ার এনে দেবে।