
দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ শতাংশের নিচে নেমে এলেও চালের দাম কমেনি, বরং তার একরোখা ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য নতুন করে চাপ তৈরি করছে। সম্প্রতি সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এককভাবে চালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশ চালেই খরচ হওয়া দেশের পুষ্টি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক।
জিইডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে গড় একটি পরিবারের খাবার খরচের প্রায় ৫১ শতাংশই গেছে শুধুমাত্র চাল কেনায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ ৩২ শতাংশ মাছ কেনায়। অর্থাৎ, মাত্র দুইটি পণ্যেই পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের ৮৩ শতাংশের বেশি চলে যাচ্ছে, যেখানে ফল, তেল, দুধ ও মাংসের মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপেক্ষিত থাকছে।
বিশ্লেষণ বলছে, মে মাসে খাদ্য ব্যয়ে চালের অবদান ছিল ৪০ শতাংশ, যা এক মাসের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। চালের জাতভেদেও মূল্যবৃদ্ধি উদ্বেগজনক—মাঝারি চালে মূল্যস্ফীতি ২৫ শতাংশ, মোটা চালে ১৭.৮২ শতাংশ এবং সব মিলিয়ে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি লক্ষ করা গেছে।
কৃত্রিম সংকট ও বাজার বিকৃতি
বাম্পার ধান উৎপাদন সত্ত্বেও চালের দাম কেন কমছে না—এ প্রশ্ন সামনে এনে জিইডি বলছে, এতে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট ও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ধান সংগ্রহের পর ২৬ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মজুতদারদের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছে।
জিইডি, মার্কিন কৃষি বিভাগ ইউএসডিএ-এর একটি তথ্য উল্লেখ করে জানায়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মোটা চালের দাম ছিল এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
খাদ্য বহির্ভূত খাতে চাপ রয়ে গেছে
মুদ্রাস্ফীতি জুনে কমে ৮.৪৮ শতাংশে দাঁড়ালেও, অ্যালকোহল, তামাক, পোশাক, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ কিছু খাতে এখনও তা দ্বি-অঙ্কে রয়ে গেছে। খাদ্য খাতে অবদান কিছুটা কমে ৩৯ শতাংশে এলেও আবাসন ও সেবামূলক ব্যয়ে চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস ধরে ১০ শতাংশ নীতিগত রেপো রেট বজায় রাখায় বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। জুনে এ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৭.১৭ শতাংশ। যদিও এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সম্ভব হয়েছে, তবে অর্থনীতির গতি মন্থর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চাল নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্বস্তি নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। চালের একক আধিপত্য খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে রাখছে। কম আয়ের মানুষের জন্য এটি পুষ্টি ও স্বাভাবিক জীবনধারার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।
তাদের মতে, চালের বাজারে মজুতদার, সিন্ডিকেট কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা চিহ্নিত করে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। চাল নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়।