
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কানাডায় চলমান ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কানাডার বর্তমান দাবানল-প্রবণ আবহাওয়ার সম্ভাবনাকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বিষাক্ত ধোঁয়া কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
চরম আবহাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক জোট ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (WWA)-এর বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অন্টারিও ও নর্থওয়েস্ট টেরিটরিতে দাবানল-অনুকূল আবহাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ দুই অঞ্চল চলতি গ্রীষ্মে দাবানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমানে কানাডাজুড়ে প্রায় ৭০০টি দাবানল জ্বলছে। আগুনে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৮ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যার বড় অংশই দেশটির বিস্তীর্ণ বোরিয়াল বনাঞ্চল। দাবানলের কারণে বিভিন্ন শহর থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং উত্তর আমেরিকার বহু শহরে অস্বাস্থ্যকর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গাছপালা ও মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, যা বনাঞ্চলকে আরও দাহ্য করে তুলছে। বর্তমানে নর্থওয়েস্ট টেরিটরিতে এমন দাবানল-অনুকূল পরিস্থিতি প্রতি দুই থেকে ছয় বছর অন্তর এবং অন্টারিওতে প্রতি ছয় থেকে ১৫ বছর অন্তর দেখা যেতে পারে। অথচ মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন না থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি গড়ে প্রতি ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় পর একবার ঘটত।
বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বোরিয়াল বন কানাডায় অবস্থিত। এসব বন ঐতিহাসিকভাবে দাবানলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগুনের তীব্রতা ও বিস্তৃতি নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চরম আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এবং WWA গবেষণা দলের সদস্য থিওডোর কিপিং বলেন, ২০২৩ সালের পর থেকে কানাডা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার দাবানলের মুখোমুখি হচ্ছে। শুধু আগুন নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানোই এ সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায়।
গবেষণার সহ-লেখক ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ও নজিরবিহীন দাবানলের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দাবানল আরও ঘন ঘন, আরও তীব্র এবং নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার দাবানল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডা থেকে আসা ধোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এ বিষয়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ারও ইঙ্গিত দেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। কানাডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসের গবেষক জোনাথন বুশার বলেন, কানাডার বিস্তীর্ণ বোরিয়াল বন প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃত ও দুর্গম। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এসব বন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই এর জন্য শুধু কানাডাকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
এদিকে দাবানলের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় “অত্যন্ত বিপজ্জনক” দাবানল পরিস্থিতির কারণে অন্তত ৮ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বর্তমান গতিতে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তথ্যসুত্র: দ্য গার্ডিয়ান