ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২০ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বিষাক্ত বাতাস কেড়ে নিচ্ছে শহরের প্রাণ, ধ্বংস করছে অর্থনীতি

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৯ সকাল

Link Copied!

শহরের ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল কি মানুষের শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিচ্ছে? গত কয়েক দশকে নগরায়ণের যে তীব্র গতি আমরা দেখেছি, তার এক করুণ পরিণতির নাম ‘বায়ুদূষণ’। সি৪০ (C40) নলেজ হাবের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বায়ুদূষণ কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি একটি শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ এই বায়ুদূষণ। এই সংকট এখন আর কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং এটি শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বায়ু দূষণের প্রভাব:
বায়ুর মান খারাপ হলে আমাদের শরীরে কী ঘটে? বাতাসে মিশে থাকা পিএম২.৫ এবং অন্যান্য ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা আমাদের ফুসফুসের সুরক্ষা প্রাচীর ভেঙে রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে। এই কণাগুলো কেবল শ্বাসকষ্ট তৈরি করে না, বরং হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ফুসফুসের ক্যানসারের মতো জটিল রোগের উৎস। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—শৈশবে যেসব শিশু এই বিষাক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠে, তাদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা সারা জীবনের জন্য কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারের বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক শহরেই এই মাত্রা কয়েক গুণ বেশি।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অদৃশ্য লোকসান:
বায়ুদূষণকে অনেকে উন্নয়নের ‘অনিবার্য মূল্য’ মনে করেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বিশ্বব্যাংকের মতে, বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৬.১ শতাংশের সমান। কর্মক্ষম মানুষের শ্রমঘণ্টা নষ্ট এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশাল ব্যয় অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ করে দিচ্ছে। বছরে ২২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয় কেবল বায়ুদূষণের কারণে শ্রমশক্তি হ্রাসের ফলে। যখন একটি দেশের বা শহরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অতিরিক্ত দূষণজনিত রোগের চাপে ভেঙে পড়ে, তখন উন্নয়নের সব সূচকই নেতিবাচক দিকে মোড় নেয়।

মেধার অপচয় ও শহর ত্যাগের প্রবণতা:
দূষণ কেবল গাছপালার ক্ষতি করছে না, এটি এখন শহর থেকে মানুষকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। দিল্লি বা বেইজিংয়ের মতো শহরের বাসিন্দারা দূষণের হাত থেকে বাঁচতে অন্যত্র স্থায়ী হওয়ার পথ খুঁজছেন। একে বলা হচ্ছে ‘স্মগ মাইগ্রেশন’। শিক্ষিত এবং দক্ষ জনবল যখন দূষিত শহর ছেড়ে চলে যায়, তখন সেই শহর তার দীর্ঘমেয়াদী মেধা ও সৃজনশীলতা হারায়। এমনকি ব্যবসায়ীরাও এখন দূষিত শহরে বিনিয়োগ বা দক্ষ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিধাবোধ করছেন। এই ‘ট্যালেন্ট ড্রেইন’ বা মেধার পাচার শহরের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

স্থবির জীবনযাত্রা:
বায়ুদূষণ যখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কেবল জনজীবন নয়, স্থবির হয়ে পড়ে পুরো মহানগরী। দিল্লিতে প্রায়ই অতিরিক্ত ধোঁয়াশার কারণে ৬ হাজার স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ করা হয় এবং কার্গো ট্রাক চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। দৃশ্যমানতা হ্রাসের ফলে বিমান চলাচল বাতিল এবং সড়ক দুর্ঘটনার হার বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ধরনের আকস্মিক পরিস্থিতি শহরের দৈনন্দিন উৎপাদনশীলতাকে পঙ্গু করে দেয়।

সচেতনতার নতুন ঢেউ:
বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন বায়ুদূষণকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করছে। বোগোতা থেকে লন্ডন বা সিউল পর্যন্ত সব জায়গায় মানুষ এখন সিটি নেতাদের কাছে পরিষ্কার বাতাস দাবি করছে। জনমতের চাপ থাকলে নীতিনির্ধারকরা কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন। শহরগুলো এখন পরিবহন থেকে নির্গমন কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ‘ক্লিন এয়ার জোন’ তৈরির মতো কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

সমাধান কোথায়:
বায়ুদূষণ কমানোর জন্য কোনো ম্যাজিক বা জাদুর কাঠির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমত, এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং ব্যবস্থা আধুনিক করা। দ্বিতীয়ত, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ও গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো। তৃতীয়ত, নির্মাণকাজের সময় ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা ও জেল-জরিমানা কার্যকর করা। চতুর্থত, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া। বোগোতার মতো শহর যারা পরিবহন নির্গমন কমিয়ে ‘আর্থশট প্রাইজ’ পেয়েছে, তারা আমাদের বড় প্রেরণা হতে পারে।

লণ্ডনের শিক্ষা ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি:
লন্ডন যেভাবে তাদের ‘আল্ট্রা লো এমিশন জোন’ (ইউএলইজেড) চালুর মাধ্যমে মাত্র নয় বছরে বায়ুর মান আইনি সীমার মধ্যে নিয়ে এসেছে, তা বিশ্ববাসীর জন্য একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ছোট ছোট পদক্ষেপ, যেমন—শহরের ভেতরে ভারী যান নিয়ন্ত্রণ বা সবুজের বিস্তার, দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং বায়ুদূষণ রোধ করা একে অপরের পরিপূরক, যা একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
এই বৈশ্বিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঢাকা, গাজীপুর বা নারায়নগঞ্জের মতো শহরগুলোর চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখানকার শহরগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় অবস্থান করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণকাজের অনিয়ন্ত্রিত ধুলোবালি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং আশেপাশের এলাকার ইটের ভাটার ধোঁয়া ঢাকার আকাশকে প্রায়শই বিষাক্ত করে তুলছে। শীত মৌসুমে এই বায়ুদূষণ এতটাই চরম আকার ধারণ করে যে তা শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। সি৪০-এর প্রতিবেদনের আলোকে দেখলে, বাংলাদেশ কেবল স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই নয়, বরং বায়ুদূষণজনিত রোগের চিকিৎসায় জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ হারাচ্ছে।

বাংলাদেশের শহরগুলোর সামনে আজ কঠিন সময়, তবে নীতিনির্ধারক ও নাগরিকদের সম্মিলিত সাহসী পদক্ষেপ নিলে এখনো ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, ‘খুব পরিষ্কার বাতাস’ বলে কিছু নেই; বাতাসের মান যত উন্নত হবে, আমাদের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ ততটাই উজ্জ্বল হবে। সময় বয়ে যাচ্ছে, এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

কলেরা হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মনো-সামাজিক পরিচর্যায় পুলিশকে প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীকে উন্নত সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব

মানুষের বদলে দেওয়া পৃথিবীতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রাণিজগৎ

রোগ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস, কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণ

জাপানে ট্রেনের ধাক্কায় চার রেলশ্রমিক নিহত

স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ল, ভরি কত?

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিস্কুট উৎপাদন, বেকারিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা

ঢাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ১ হাজার ৮৪১ মামলা

তিস্তার ভাঙনে বিলীন স্কুল, পরে ফেলা হচ্ছে জিওব্যাগ

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা, বরগুনা পৌরসভায় বাড়ছে জনভোগান্তি

দুপুরের মধ্যে ৬ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা