
বিশ্বজুড়ে সামাজিক রীতিনীতি, অর্থনৈতিক কাঠামো ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কারণে পুরুষদের প্রথম বিয়ের গড় বয়সে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে কৈশোরোত্তীর্ণ যুবকরা পরিবারের চাপে অল্প বয়সেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতেন, সেখানে এখন অনেক দেশে সেই গড় বয়স পৌঁছে গেছে মধ্য ত্রিশে বা তার চেয়েও উপরে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, উন্নত ও উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে অনেক দেরিতে বিয়ে করছেন।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপের দেশ স্পেন, যেখানে গড় পুরুষ প্রথমবার বিয়ে করছেন প্রায় ৪০.৮ বছর বয়সে। স্পেনের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা এবং নরওয়েতেও গড় বয়স ৩৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে অবস্থান করছে। এই প্রবণতার অন্যতম কারণ হিসেবে গবেষকরা দেরিতে কর্মজীবন শুরু, শিক্ষাজীবনের দীর্ঘতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি আকর্ষণকে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তরুণ প্রজন্ম নিজের পছন্দ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিবেচনায় বিয়ের সিদ্ধান্ত স্থগিত করছেন।
ব্রাজিল, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলোতেও এই বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি। বিশেষত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোতে যেমন সুইডেন বা নরওয়ে—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতনতা থাকার কারণে বিয়ে দেরিতে হচ্ছে, আবার অনেকেই সঙ্গীর সঙ্গে দীর্ঘদিন সহবাস করেও আইনগতভাবে বিয়ে করছেন না। ফলে, বিয়ের গড় বয়স আরো বাড়ছে।
অন্যদিকে, মধ্য ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে গড় বয়স কিছুটা কম, যেমন পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র ও বুলগেরিয়ায় গড় বয়স ৩২ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে। এ অঞ্চলের পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে আগে বিয়ে করলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যেও পশ্চিমা প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোর মতো এখানেও দেরিতে স্থায়ী চাকরি পাওয়া, অর্থনৈতিক চাপ, ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় অনেকেই আগে নিজের অবস্থান মজবুত করতে চান।
উত্তর আমেরিকার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে গড় বিয়ের বয়স ৩২, আর কানাডায় তা কিছুটা কম, ৩০.৮। এগুলো তুলনামূলকভাবে উচ্চ হলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় নিচের দিকেই রয়ে গেছে। গবেষকরা বলেন, আমেরিকান সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও সম্পর্কের বিকল্প মডেল যেমন সহবাস বা ‘লিভ-ইন’ এর বৈধতা থাকার ফলে আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেকে অনুভব করেন না।
এশিয়ার দিকে নজর দিলে একধরনের বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষেরা গড় ৩৯ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে করেন, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ। জাপানেও গড় বয়স ৩১.১। প্রযুক্তি নির্ভর, উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক সমাজব্যবস্থা, কর্মঘণ্টার চাপ, ও একাকীত্বের অভিজ্ঞতা এই বয়স বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। বিপরীতে, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে এখনো গড় বয়স অনেক কম। ভারতীয় পুরুষেরা গড়ে ৩০ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে করেন, আর পাকিস্তানে তা আরও কম, ২৮.৪ বছর। সামাজিক চাপে, পরিবারকেন্দ্রিক সমাজে বিয়ে এখনো একটি ‘অবশ্য করণীয়’ হিসেবে দেখা হয়।
ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার গড় বয়স ৩৮.৮ যা অবাক করার মতো, যেখানে মেক্সিকো বা এল সালভাদরের মতো দেশে তা যথাক্রমে ৩৩.৪ ও ২৫.৫। এই পার্থক্যের মূল কারণ অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিন্নতা, সামাজিক মূল্যবোধ, ও অঞ্চলভেদে শিক্ষার প্রভাব।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, তুরস্ক, গ্রিস, পর্তুগাল, রাশিয়া, ইউক্রেন, ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর চিত্রও মিলিতভাবে তুলে ধরে যে বিশ্বব্যাপী বিয়ের বয়স এখনো এক রৈখিক গতিতে বাড়ছে না। বরং প্রতিটি দেশের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিস্তারের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তে বৈচিত্র্য রয়েছে।
এই পরিবর্তনের আরও একটি দিক হল, গড় বয়সে বিয়ে যত দেরিতে হচ্ছে, তত বেশি পুরুষ দীর্ঘ সময় সিঙ্গেল থেকে যাচ্ছেন, অথবা অনেকে চিরকাল অবিবাহিত থাকছেন। জাতিসংঘ, ও ইইউর স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন রিপোর্ট এবং জাতীয় স্তরে পরিচালিত জরিপ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তথ্যসমূহ শুধু সমাজের বিবর্তন নয়, আগামী প্রজন্মের জন্মহার, কর্মক্ষম জনসংখ্যা, এবং পারিবারিক কাঠামোতেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
সবশেষে বলা যায়, গড় বয়সে বিয়ের এই বৃদ্ধি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফসল নয়, বরং এর পেছনে কাজ করছে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের তরঙ্গ, যা ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। সমাজ যতই উন্নত হচ্ছে, মানুষ তত বেশি নিজস্ব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও মানসিক প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।