
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নভেম্বর মাসেও উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। নভেম্বরে সংক্রমণ কিছুটা কমলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে অক্টোবরের শেষ দিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার এবং রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৮৪ জন। শুধু ২৫ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ২৪৯ জন এবং মারা গেছেন সাতজন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অধ্যাপক কবিরুল বাশারের বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে। নভেম্বর মাসে প্রকোপ কিছুটা কমলেও উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্তে জোর
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস করা। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, কোথায় মশা বংশবিস্তার করছে, কোন ধরনের স্থানে লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশক কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রজননস্থল শনাক্ত না করে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

এডিস মশা শুধু নর্দমা বা রাস্তার পাশেই জন্মায় না। বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ভবনের বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকা, ছাদ-বারান্দায় পড়ে থাকা পাত্র, ফুলের টব, পানির ট্যাংক এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতেও এ মশা বংশবিস্তার করতে পারে। অনেক সময় ভবনের ভেতরে বা দুই ভবনের মধ্যবর্তী স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের আওতার বাইরে থেকে যায়। ফলে এসব স্থানে মশার প্রজনন অব্যাহত থাকতে পারে।
বৃষ্টির ধরন ও আবহাওয়ার পরিবর্তন মশার প্রজননের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বর্ষা শেষ হওয়ার পরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। তবে নভেম্বর মাসে সংক্রমণ ঠিক কতটা বাড়বে বা কমবে, তা নির্ভর করবে রোগীর সংখ্যা, মশার ঘনত্ব, আবহাওয়া এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের ওপর।
শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তবে শুধু ওষুধ ছিটানো বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি এবং ব্যবহৃত কীটনাশক কার্যকর কি না-এসব বিষয় যাচাই করে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

মশার লার্ভা ধ্বংসে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ফগিং করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জমি, নালা, ছাদ এবং পানি জমে থাকার অন্যান্য স্থান নিয়মিত পরিদর্শন করা প্রয়োজন। কোনো একটি বাড়িতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও আশপাশের স্থানে প্রজনন চলতে থাকলে ঝুঁকি থেকে যায়। এ কারণে এলাকাভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা যাচাই করতে নিয়মিত জরিপ ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি প্রয়োজন। কোথায় লার্ভার ঘনত্ব বেশি, কোন পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে-এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জ্বর হলে অবহেলা নয়
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গু হতে পারে, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও কোনো কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তবে যেকোনো বয়সের মানুষ গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। জ্বর হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।
প্লাটিলেট কমলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে কোনো কোনো রোগীর রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগীর শারীরিক অবস্থা বা রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। রক্তচাপ, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, শরীরে তরলের ভারসাম্য, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। প্লাটিলেট কমেছে বলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
চলতি বছরের ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাওয়া বা শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে-এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-তথ্য বা গবেষণা প্রয়োজন। একইভাবে নতুন কোনো ডেঙ্গু ভেরিয়েন্টের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরীক্ষা ও চিকিৎসায় সতর্কতা
জ্বর দেখা দিলে ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগের কোন পর্যায়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। উপসর্গ ও অসুস্থতার সময়কাল বিবেচনা করে চিকিৎসক পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর বা ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাড়ি ও কর্মস্থলে পানি জমতে দেওয়া যাবে না
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফুলের টবের নিচের ট্রে, অব্যবহৃত বালতি, ড্রাম, বোতল, ফেলে রাখা টায়ার ও অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে। পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করাও জরুরি।

নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ছাদ, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত বা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে না থাকে। মশার কামড় এড়াতে মশারি ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
নভেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ পুরোপুরি কমে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অধ্যাপক কবিরুল বাশারের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এ মাসেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে এবং উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাই এখনই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।