
তামাকপণ্যের কর ও মূল্য কাঠামোয় কার্যকর সংস্কার আনা হলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে দাবি করেছে ঢাকা আহছানিয়া মিশন। তারা বলছে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে দাম বৃদ্ধি, সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ এবং বিড়ি, জর্দা ও গুলসহ সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্য ও কর বাড়ানো হলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে ঢাকা আহছানিয়া মিশন। সংগঠনটির তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক ও তামাকজাত পণ্যের কর ও মূল্য কাঠামো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সামান্য বাড়ানো হলেও বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য আরও কমে যাবে এবং এগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য হবে। এতে বিশেষ করে তরুণ, নারী ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাকের ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে, যার প্রধান ভোক্তা দরিদ্র ও তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ দেশের মাথাপিছু আয় ও মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে বেশি হওয়ায় প্রকৃত অর্থে সিগারেট আরও সস্তা হয়ে পড়বে।
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ, প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হলে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। একই সঙ্গে তামাক ব্যবহারের হার কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিগারেটের মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও কর কাঠামোয় কোনো মৌলিক সংস্কার আনা হয়নি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হবে এবং সেই অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখার ফলে এসব পণ্য আরও সস্তা ও সহজলভ্য হবে। এতে বিশেষ করে নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিষিদ্ধকরণের সুপারিশ উপেক্ষা করে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে কার্যত এসব নতুন পণ্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করে সংগঠনটি। তাদের মতে, এতে নতুন ধরনের নিকোটিন আসক্তি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
ঢাকা আহছানিয়া মিশন চূড়ান্ত বাজেটে তামাক কর ও মূল্য কাঠামোর সংস্কার, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে মূল্য বৃদ্ধি, সুনির্দিষ্ট করপদ্ধতি চালু, বিড়ি, জর্দা ও গুলের কর ও মূল্য বৃদ্ধি এবং নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোসহ সব ধরনের উদীয়মান নিকোটিন পণ্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাসউদুল হক এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।