ঢাকাবুধবার , ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

জলবায়ু পরিবর্তনে দ্বিগুণ সংকটে চরাঞ্চল, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জোর দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ১৫, ২০২৬ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ । ৩৬ জন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে দেশের উপকূলীয় বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ “দ্বিগুণ সংকটে” পড়েছে বলে জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, এই জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন কেবল উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং ন্যায্যতার প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত “মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা: চরাঞ্চলের একটি উপেক্ষিত বাস্তবতা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে কোস্ট ফাউন্ডেশন, ইক্যুইটিবিডি ও বিডিসিএসও প্রসেস।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। অথচ সেখানে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ স্লোগান বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জনাব, এম. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চরাঞ্চলে প্রায় ১ কোটি মানুষ বসবাস করে, যারা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে দ্বিগুণ সংকটে রয়েছে। দুর্যোগের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসার কোনো ব্যবসস্থাই থাকে না। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে চরাঞ্চলের মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। চিকিৎসাসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার, তিনি চরাঞ্চলে ৪জি নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান, যাতে মানুষ সহজেই এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারে।এছাড়া তিনি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ মাতৃসেবাকেন্দ্র স্থাপন এবং ধাত্রীদের আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে তারা জটিল পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে।

বিডিসিএসও প্রসেস-এর সমন্বয়কারী মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, চরাঞ্চলে বসবাসরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ কমপক্ষে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে তা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি চরাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মোবাইল মেডিকেল টিম জোরদার করে সবচেয়ে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এটা রাষ্ট্রের জরুরী দায়িত্ব।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান এম. এ. হাসান। পটুয়াখালীর-চরহাদি, ভোলার-চরমোজাম্মেল, চর জহিরউদ্দিন, চটকিমারা, নাগরপাটওয়ারীর চর, চর নিউটন -এর মতো অসংখ্য চর রয়েছে উপকূলে, যেখানে লক্ষ-লক্ষ মানুষ বাস করে, কিন্তু নুন্যতম স্বাস্থ্যসেবা নেই, নেই কোন কমিউনিটি ক্লিনিক, অথচ এই ব্যপারে যথাযথ পদক্ষেপও দেখতে পাচ্ছিনা। চরাঞ্চলকে সাধারণ গ্রামীণ এলাকার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে “চরাঞ্চল স্বাস্থ্যখাত” নামে পৃথক বাজেট লাইন প্রণয়ন করা জরুরি। তিনি দাবি করেন, বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য বাজেট ও লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

স্যোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-এর সহকারী পরিচালক সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিতেও স্থানীয়দের দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়, যা যথেষ্ট সময় ও ব্যায় সাপেক্ষ ও ঝঞ্ঝাটপূর্ণ। দুর্যোগকালীন সময়ে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয় এখানকার অধিবাসীরা, ফলে সাধারণ রোগও মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সেবার অভাবে মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। জরুরি মুহূর্তে রোগী অথবা গর্ভবতী মায়েদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

বক্তারা আরও বলেন, চরাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, দক্ষ ধাত্রী তৈরি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল নিশ্চিত করে দুর্গম এসব এলাকায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার—এবং তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।