
প্রকৃতির অনন্য কারিগর হিসেবে পরিচিত বাবুই পাখি এবং তাদের শৈল্পিক বাসা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চল থেকে। একসময় যেসব এলাকায় শত শত বাবুই পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত পরিবেশ, সেখানে এখন দেখা মিলছে না এই পাখির। পরিবেশবিদরা বলছেন, আবাসস্থল ধ্বংস, কীটনাশকের ব্যবহার, শিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাবুই পাখি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাত্র দুই বছর আগেও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার স্বনির্ভর রাবার কারখানা এলাকা, দক্ষিণ গোলাবাড়ি মারমাপাড়া, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও গুগড়াছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বাবুই পাখি দেখা যেত। বর্তমানে দক্ষিণ গোলাবাড়ি এলাকার একটি তালগাছে মাত্র পাঁচটি বাবুই বাসা টিকে আছে।
সম্প্রতি গুগড়াছড়ি ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময় যেখানে সকাল-সন্ধ্যায় বাবুই পাখির কলতানে চারপাশ মুখরিত থাকত, সেখানে এখন গাছ থাকলেও নেই কোনো বাবুই পাখি কিংবা তাদের বাসা। এতে হতাশ হয়ে ফিরছেন পাখিপ্রেমীরাও।
দক্ষিণ গোলাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ক্যাচিং মারমা জানান, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার বাড়ির তাল ও নারকেল গাছে বাবুই পাখি বাসা বেঁধে আসছে। তবে আগের তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে আশপাশের খেজুর গাছেও শত শত বাবুই বাসা দেখা যেত, এখন আর সেগুলোতে পাখি আসে না।
স্থানীয় বাসিন্দা তুতুল মারমা, ক্রাজাইরি মারমা ও থুইম্রা মারমা বলেন, প্রতিবছর জুন মাসে বাবুই পাখিরা দল বেঁধে গ্রামে এসে বাসা তৈরি করত। তাদের কিচিরমিচির শব্দে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। এখন সেই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। যদিও মাঝেমধ্যে শিকারিরা এলেও গ্রামবাসীরা পাখি রক্ষায় বাধা দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে তাল, নারকেল ও সুপারি গাছ কাটার পাশাপাশি কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ম্য, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাবুই পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি-এর নির্বাহী সদস্য সাথোয়াই মারমা বলেন, একসময় খাগড়াছড়িতে প্রচুর বাবুই পাখি ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফসলি জমি ও গাছপালা কেটে বসতি গড়ে তোলায় পাখিদের খাবার ও বাসা তৈরির উপকরণের সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বাবুই পাখিকে শুধু বইয়ের পাতাতেই চেনে।
তিনি আরও বলেন, উপযুক্ত গাছের অভাবে এখন বাবুই পাখিকে আমগাছ ও বটগাছেও বাসা বানাতে দেখা যাচ্ছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক। বাবুই পাখির আবাসস্থল রক্ষায় তাল, সুপারি ও নারকেল গাছ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি বন বিভাগ-এর সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এস এম মোশাররফ হোসাইন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে পাখির আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত অনেক গাছ এখন সংকটাপন্ন। বাবুইসহ বিভিন্ন পাখির জন্য উপযোগী তাল, খেজুর ও অন্যান্য বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয়দের মাঝে চারা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, পরিবেশের এই অনন্য কারিগরকে রক্ষা করা শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্যও জরুরি। বাবুই পাখিকে পাহাড়ে ফিরিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।