
আজকাল বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পেটের নানাবিধ অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর শারীরিক অবস্থার মধ্যে ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ বা আইবিডি অন্যতম মারাত্মক এক ব্যাধি। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ রোগ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই ‘ক্রোনস ডিজিজ’ এবং ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’-এর মধ্যকার মূল পার্থক্যগুলো বুঝতে পারেন না। মূলত এই দুটি ভিন্ন শারীরিক অবস্থাই আইবিডির অন্তর্ভুক্ত।
উভয় রোগেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) ভুলবশত পরিপাকতন্ত্রের ওপর হামলা চালায়। এর ফলে অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ঘা তৈরি হয়। তবে এই দুই ব্যাধির মধ্যে আক্রান্ত স্থান, উপসর্গ, শারীরিক জটিলতা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
আইবিডি আসলে কী? :
ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ মূলত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহের অন্ত্রে বিদ্যমান উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা এবং বংশগত জিনগত কারণ এই রোগগুলোর মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
আইবিডিতে আক্রান্ত রোগীর অনাক্রম্যতন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেম পরিপাকতন্ত্রের সুস্থ টিস্যুকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে। আইবিডি একটি দীর্ঘস্থায়ী বা সারা জীবনের ব্যাধি। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই এই রোগের গতিপথ দুটি পর্যায়ে আবর্তিত হয়। প্রথমটি হলো ‘রেমিশন’, যখন রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে। দ্বিতীয়টি হলো ‘ফ্লেয়ার-আপ’, যখন সাময়িকভাবে শান্ত থাকা লক্ষণগুলো হঠাৎ তীব্র হয়ে ফিরে আসে।
বর্তমানে আইবিডি রোগ পুরোপুরি নিরাময় করার মতো কোনো ওষুধ বা প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রেখে রোগীকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখা সম্ভব।
আইবিডি ও আইবিএস-এর পার্থক্য :
অনেকেই আইবিডি এবং আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম)-কে একই রোগ মনে করে গুলিয়ে ফেলেন। দুটির প্রাথমিক কিছু লক্ষণ যেমন— পেটে ব্যথা বা পায়খানার সমস্যা একই হলেও, এদের মূল কারণ ও প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আইবিএস পরিপাকতন্ত্রের কোনো স্থায়ী প্রদাহ বা অন্ত্রের টিস্যুর ক্ষতি করে না এবং এর থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু আইবিডি অন্ত্রের ভেতরের দেয়ালে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে এবং সঠিক চিকিৎসা না পেলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
ক্রোনস ডিজিজ:
ক্রোনস ডিজিজ হলো এমন এক ধরনের প্রদাহজনিত রোগ যা পরিপাকতন্ত্রের যেকোনো স্থানে হতে পারে। মুখ গহ্বর থেকে শুরু করে পায়ুপথ পর্যন্ত পরিপাকতন্ত্রের যেকোনো অংশ এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষুদ্রান্ত্রের শেষ ভাগ এবং বৃহদান্ত্রের শুরুর অংশে আক্রমণ করে।
ক্রোনস ডিজিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অন্ত্রের সব অংশে একসঙ্গে না হয়ে কিছু কিছু জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হতে পারে। তাছাড়া এই প্রদাহ অন্ত্রের দেয়ালের গভীরতম স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করে।
প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গ : অনবরত পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া এবং মাঝেমধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য। তলপেটে মারাত্মক খিঁচুনি বা ব্যথা এবং ঘন ঘন জ্বর আসা। পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়া ও অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চরম ক্লান্তি। দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণে ব্যর্থ হওয়া। গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের বাইরে ত্বকে ফুসকুড়ি, জয়েন্টে ব্যথা ও চোখের সমস্যা দেখা দেওয়া। এবং অন্ত্রে ফিস্টুলা বা ফোড়া তৈরি হওয়া।
জটিলতা ও চিকিৎসা :
ক্রোনস ডিজিজে বারবার প্রদাহ ও তা শুকানোর ফলে অন্ত্রের ভেতরের পথ সংকুচিত হয়ে যায়, যা খাদ্য চলাচলে বাধা বা ব্লকেজ তৈরি করে। ওষুধই ক্রোনস ডিজিজ ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। চিকিৎসকরা সাময়িক প্রদাহ কমানোর জন্য স্টেরয়েড, ইনফেকশনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, ইমিউনোমোডিউলেটর এবং উন্নত প্রযুক্তির বায়োলজিক ওষুধ ব্যবহার করেন। ওষুধে কাজ না হলে বা ফিস্টুলা খুব মারাত্মক হলে সার্জারির প্রয়োজন হয়।
আলসারেটিভ কোলাইটিস :
ক্রোনস ডিজিজের সাথে আলসারেটিভ কোলাইটিসের বড় পার্থক্য হলো এটি পুরো পরিপাকতন্ত্রে ছড়ায় না। এটি কেবল বৃহদান্ত্র বা কোলোনে সীমাবদ্ধ থাকে। তাছাড়া এটি অন্ত্রের গভীর স্তরে যায় না, বরং বৃহদান্ত্রের ভেতরের ওপরের স্তরে একনাগাড়ে ও সমানভাবে প্রদাহ এবং ঘা তৈরি করে।
ক্ষতের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আলসারেটিভ কোলাইটিসকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: আলসারেটিভ প্রোক্টাইটিস (কেবল মলদ্বারে সীমাবদ্ধ), লেফট-সাইডেড কোলাইটিস (বৃহদান্ত্রের নিম্নভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত) এবং এক্সটেনসিভ কোলাইটিস (পুরো বৃহদান্ত্র জুড়ে আক্রান্ত)।
প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গ : তলপেটে তীব্র ব্যথা ও মোচড় দেওয়া। মলের সঙ্গে তাজা রক্ত ও শ্লেষ্মা বের হওয়া। ঘন ঘন মলত্যাগের তীব্র বেগ হওয়া এবং বাথরুমে যাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। ক্ষুধা মন্দা, অতিরিক্ত ওজন হ্রাস এবং অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা।
জটিলতা ও চিকিৎসা :
চিকিৎসা না করা হলে আলসারেটিভ কোলাইটিস থেকে বৃহদান্ত্রে ছিদ্র হতে পারে। এছাড়া কোলোন ক্যান্সার ও হাড় ক্ষয়ের মতো মারাত্মক ব্যাধি দেখা দিতে পারে। এই রোগের প্রাথমিক চিকিৎসাও ওষুধ দিয়ে শুরু হয়। তবে ক্রোনস ডিজিজের তুলনায় আলসারেটিভ কোলাইটিসে সার্জারির প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কম। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রোনস রোগীদের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশের সার্জারির প্রয়োজন হলেও, আলসারেটিভ কোলাইটিসের ক্ষেত্রে তা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ।
যেভাবে ডায়াগনোসিস করা হয় :
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা রক্ত ও মল পরীক্ষার পাশাপাশি কোলনোস্কোপি, সিগময়ডোস্কোপি কিংবা সিটি স্ক্যানের সাহায্য নেন। কোলনোস্কোপির মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রের ভেতরের অবস্থান সরাসরি দেখে টিস্যু বায়োপসি করা হয়, যা সঠিক রোগ চিহ্নিত করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিস— যেটাই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। ফ্লেয়ার-আপের সময় অতিরিক্ত আঁশযুক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, ধূমপান ত্যাগ করা এবং মানসিক চাপ কমানো দরকার। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক ও কার্যকর জীবনযাপন করতে পারেন।
সূত্র : Healthline ও Crohn’s & Colitis Foundation.