
পটুয়াখালীর পর্যটননগরী কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে অব্যাহত ভাঙনে জিরো পয়েন্টসংলগ্ন ট্যুরিস্ট পুলিশের একমাত্র পুলিশ বক্সটি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। পূর্ণিমার জোয়ার, বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ে প্রতিদিন সৈকত থেকে বালু সরে যাওয়ায় বক্সটির নিচের মাটি ধসে পড়ছে। আর এক-দুই দিন ভাঙন অব্যাহত থাকলে বক্সটি সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক দিনের টানা জোয়ার ও উত্তাল ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানি আগের তুলনায় অনেক ভেতরে উঠে আসায় জিরো পয়েন্টসহ সৈকতের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভাঙন বেড়েছে। এতে পুলিশ বক্সের পাশাপাশি আশপাশের মসজিদ, মন্দির, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটন অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, গত এক বছর ধরে পুলিশ বক্সটির আশপাশের অংশ সমুদ্রে বিলীন হচ্ছে। সমুদ্র উত্তাল হলেই তারা আতঙ্কে থাকেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা ও উপজেলা মাসিক সভাসহ বিভিন্ন দফতরে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, গত চার দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। তাই বক্সের ভেতরে থাকা সব মালামাল সরিয়ে অফিসে রাখা হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা কোনোভাবে সামনের অংশে বসে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি হ্যান্ডমাইকে পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে। আর দু-এক দিন এভাবে বালুক্ষয় হলে পুলিশ বক্সটি সাগরে চলে যেতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জিরো পয়েন্টের অস্থায়ী পুলিশ বক্সটির নিচের মাটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধসে গেছে। এতে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটকদের চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক এলাকায় ঘোরাফেরা করায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রেদওয়ানুল ইসলাম রাসেল বলেন, জোয়ারের সময় ঢেউ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ভেতরে চলে আসছে। কয়েক মাস আগেও যেসব জায়গায় পর্যটকেরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেন, সেখানে এখন বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। মসজিদ, মন্দির ও পুলিশ বক্সের কাছাকাছি পর্যন্ত পানি চলে আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটন অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক তাহমিদ হোসেন বলেন, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে সৈকতের ভাঙনের এমন দৃশ্য দেখে তিনি হতাশ। দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রের এমন পরিস্থিতি পর্যটকদের জন্যও উদ্বেগের। সৈকতের সৌন্দর্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কুয়াকাটা শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির তীর্থযাত্রী সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন মণ্ডল বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ধর্মীয় এলাকায় স্থায়ী উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটাকে ঘিরে শত শত কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও ট্রাভেল এজেন্সিসহ বিভিন্ন পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সৈকতের ভাঙন ও পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পর্যটনশিল্প ক্ষতির মুখে পড়বে। কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত বড় পরিসরের উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সটি রক্ষায় আপাতত বালুর বস্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ কাজ করা হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব আরিফুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে একটি স্পনসর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হয়েছে। বর্তমান পুলিশ বক্সটি বিলীন হয়ে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাশে নতুন একটি পুলিশ বক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও এতে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। কুয়াকাটার সৈকত, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।