ঢাকাসোমবার , ১৮ মে ২০২৬
  • অন্যান্য

উটের চোখের জলেই মিলছে সাপের বিষের প্রতিষেধক

রাজ কিরণ দাস
মে ১৮, ২০২৬ ৩:৪৪ অপরাহ্ণ । ৫৩ জন

বিশ্বজুড়ে সাপের কামড় এখনো একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সাপের বিষে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হন। এমন বাস্তবতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক সম্ভাবনার খবর সামনে এনেছে সাম্প্রতিক গবেষণা- উটের চোখের জল।

২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উটের চোখের জলে “ল্যাকটোফেরিন” নামের একটি বিশেষ প্রোটিন রয়েছে, যা ৪০টিরও বেশি প্রজাতির সাপের বিষকে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা রাখে। শুধু তাই নয়, এই প্রোটিনের সঙ্গে থাকা অ্যান্টিবডি ও বিশেষ বাইন্ডিং উপাদানগুলো সাপের বিষের নিউরোটক্সিন ও হিমোটক্সিনের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলোকে অকার্যকর করে দিতে পারে।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক সাধারণত নির্দিষ্ট সাপের জন্য তৈরি হয়। অর্থাৎ, এক ধরনের সাপের বিষের জন্য তৈরি ওষুধ অন্য সাপের ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। ফলে চিকিৎসা প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যেখানে সাপের প্রজাতি দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন।

এছাড়া প্রচলিত অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণের জন্য ঠান্ডা পরিবেশ প্রয়োজন হয়, যা অনেক গ্রামীণ বা দূরবর্তী অঞ্চলে নিশ্চিত করা কঠিন। ফলে জরুরি চিকিৎসা অনেক সময় বিলম্বিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে উটের চোখের জলে পাওয়া প্রোটিনটি একাধিক দিক থেকে ভিন্ন। এটি একাধিক প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাতেও স্থিতিশীল থাকে- যা গরম অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

বিবর্তনের অনন্য উদাহরণ

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রোটিনের কার্যকারিতা এসেছে দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে। উট সাধারণত আরব ও আফ্রিকার মরুভূমিতে বসবাস করে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের বিষধর সাপের উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একই পরিবেশে টিকে থাকার ফলে তাদের দেহে এমন একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, উটের চোখের জলের মাত্র এক মিলিলিটারেই প্রায় ৩০০ মাইক্রোগ্রাম সুরক্ষামূলক উপাদান থাকে। এই পরিমাণই কোবরা, ভাইপার এবং ক্রেইটের মতো মারাত্মক সাপের বিষ প্রতিহত করতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষণা থেকে বাস্তব প্রয়োগে

যদিও এই আবিষ্কার এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এই প্রোটিনকে কৃত্রিমভাবে তৈরি (সিন্থেসাইজ) করার কাজ শুরু করেছে। তাদের লক্ষ্য একটি “সর্বজনীন অ্যান্টিভেনম” তৈরি করা, যা বিভিন্ন ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কার্যকর হবে।

তবে এই প্রক্রিয়া সহজ নয়। প্রোটিনটির কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং মানুষের শরীরে প্রয়োগযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অনুমোদন প্রক্রিয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই গবেষণা সফলভাবে বাস্তব প্রয়োগে রূপ নেয়, তাহলে সাপের কামড়জনিত চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে চিকিৎসা অবকাঠামো সীমিত, সেখানে এটি জীবনরক্ষাকারী সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে।

সব মিলিয়ে, উটের চোখের জল নিয়ে এই গবেষণা শুধুমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়- এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি সম্ভাবনাময় অগ্রগতি। এখন নজর পরবর্তী ধাপে- এই আবিষ্কার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তব চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়।

Facebook Comments Box

Jaxx Liberty Wallet

Jaxx Wallet Download