
ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো সেপ্টেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, তাপমাত্রার সর্বশেষ এই রেকর্ড শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনো ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ডে নিয়ে যেতে পারে।
সোমবার প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এল নিনো পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ‘নিনো ৩.৪’-এ গত সেপ্টেম্বরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, এই তাপমাত্রা ১৯৮২-১৯৮৩, ১৯৯৭-১৯৯৮ এবং ২০১৫-২০১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে বর্তমান এল নিনোই পর্যবেক্ষণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই বলে জানিয়েছে কোপার্নিকাস। সংস্থাটির মতে, সেপ্টেম্বরে পাওয়া তাপমাত্রার মান একটি ব্যতিক্রমী শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে, ঘটনাটি এখনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে সাম্প্রতিক এল নিনো ঘটনাগুলো অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী বলে মনে হতে পারে। ঐতিহাসিক তুলনার এই জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে কোপার্নিকাস একটি নতুন সূচক ব্যবহার করছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই সূচকে বর্তমান এল নিনো এখনো অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
এদিকে শুক্রবার জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনোর পরিস্থিতি নথিভুক্ত ইতিহাসের সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। তবে এল নিনোর তীব্রতা নির্ধারণে বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা একই মানদণ্ড ব্যবহার করে না।
সমুদ্র ও বৈশ্বিক তাপমাত্রায় নতুন রেকর্ড
এল নিনোর তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রাও নতুন রেকর্ড গড়েছে। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ড করা ২০ দশমিক ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল সর্বোচ্চ।
সামগ্রিকভাবে গত সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্বে নথিভুক্ত দ্বিতীয় উষ্ণতম সেপ্টেম্বর। ওই মাসে ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত প্রাক্-শিল্প যুগের গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্-শিল্প যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছিল। তবে জাতিসংঘ সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা কয়েক বছরের মধ্যেই অতিক্রান্ত হতে পারে।
কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেছেন, বিশ্ব আবার এমন একটি সময়পর্বে প্রবেশ করেছে, যখন মাসের পর মাস তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকছে। শক্তিশালী এল নিনো এখনো তীব্রতর হওয়ায় এ পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্যারিস চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা সীমা অতিক্রম করা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে বিশ্ব কতটা বেশি উষ্ণতার মুখোমুখি হবে এবং তা কত দিন স্থায়ী হবে, সেটি মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে যত দিন বেশি থাকবে, সেই সময়কাল কমিয়ে আনতে এবং তাপমাত্রা যত দ্রুত সম্ভব নিচে নামাতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।
এল নিনো কী, এর প্রভাব কী?
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়। এ সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। কোনো কোনো অঞ্চলে খরা এবং অন্য অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং এটি প্রায় নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। এবারের এল নিনো বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাসদাতারা সতর্ক করে আসছেন। এর প্রভাবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।