
তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও আইন সংশোধনে গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। তিনি বলেছেন, গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের বোঝানো সম্ভব। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষণার ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক পরামর্শক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক নিয়ে কী ধরনের গবেষণা হবে, সেটি সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতেই তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। নীতিনির্ধারকদের কোনো বিষয়ে রাজি করাতে গবেষণালব্ধ ফলাফল তাদের সামনে উপস্থাপনের কোনো বিকল্প নেই।
ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের অধ্যাদেশে ই-সিগারেট অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু চলতি বছরের ১০ এপ্রিল আইন পাসের সময় ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ বাদ পড়ে। এর একটি কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এসব পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বলেন, এসব পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা থাকলে তা নীতিনির্ধারকদের সামনে উপস্থাপন করা যেত এবং আইনের আওতায় রাখার পক্ষে যুক্তি আরও শক্তিশালী হতো। বিশেষ করে দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি। বিষয়টি ঠেকানোর চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে এ খাতে গবেষণাকে জরুরি বলে মন্তব্য করেন।
পার্বত্য এলাকায় বাড়তে থাকা তামাক চাষের ওপরও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন শেখ মোমেনা মনি। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে, বিশেষ করে সাঙ্গু নদীর দুই পাড়ে তামাক চাষ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তামাক চাষে ব্যবহৃত পানি নদীতে পড়ার ফলে মাছ ও জলজ পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সেটিও গবেষণার আওতায় আনা যেতে পারে।
তামাক ব্যবহারের সঙ্গে অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণার আহ্বান জানান তিনি। শেখ মোমেনা মনি বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত কর্মসূচিতে তামাক ব্যবহারজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে তামাকের কারণে অসংক্রামক রোগের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন। এসব তথ্য তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য সহায়ক হবে।
তামাকজাত পণ্যের খুচরা ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রি বন্ধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণার প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সিগারেট বিক্রি করা ব্যক্তিদের এই পেশা থেকে সরিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, সেটিও গবেষণায় তুলে ধরা প্রয়োজন।
শেখ মোমেনা মনি বলেন, একসময় পদ্মা নদীর ফেরিঘাট এলাকায় শত শত দোকান ছিল। সেতু নির্মাণের পর ওই ব্যবসাগুলো আর আগের মতো নেই। কিন্তু মানুষ অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছে। একইভাবে তামাক বিক্রির সঙ্গে যুক্তদের বিকল্প পেশায় পুনর্বাসন করা সম্ভব হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে, সেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা যেতে পারে।
সিঙ্গেল স্টিক বা খুচরা সিগারেট বিক্রি বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এই অতিরিক্ত সচিব। তিনি বলেন, অনেক স্কুলশিক্ষার্থী পুরো প্যাকেট কেনার সামর্থ্য না থাকায় একটি করে সিগারেট কেনা দিয়ে ধূমপান শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে তারা আসক্ত হয়ে পড়ে। তাই সিঙ্গেল স্টিক বিক্রি বন্ধ করা গেলে কতসংখ্যক শিশুকে ধূমপানে আসক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব, সে বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমি জাস্ট অল্প কিছু সেক্টর বললাম’-এ ধরনের আরও অনেক বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণালব্ধ ফলাফল দিয়ে নীতিনির্ধারকদের বোঝানো গেলে ভবিষ্যতে আইন সংশোধনের সময় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
সভায় তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষণায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরামর্শক সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান, বিএমইউর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম. আতিকুল হক, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের ডিন ডা. কামরান উল বাসেত, ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোলের পরামর্শক ডা. সিজাল শরাফ, বিসিসিপির পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহানসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।