
হাসান মাহমুদ
বাংলাদেশের পাহাড়ি বনগুলোতে বিচরণ করা এশীয় হাতি মহাবিপন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, অন্যদিকে অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানুষ-হাতি সংঘাতের কারণে প্রজাতিটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর সেলেট, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে আরও তিনটি মৃত্যুর ঘটনায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫১টিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংরক্ষণ কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকায় এই বিশাল প্রাণীকুল আজ ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে।
বাংলাদেশে হাতি মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে আবাসস্থলের ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল (যেমন কোরিয়ান ও চায়না এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন) এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হাতির শতাব্দী প্রাচীন করিডোর বা চলাচলের পথগুলোকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। করিডোর বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হাতিগুলো তাদের চেনা পথ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।
এছাড়া ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়দের হাতে বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণের প্রচলন হাতি মৃত্যুর হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদুতে একটি মৃত হাতির শরীর কেটে নেওয়ার অমানবিক ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সংবেদনশীলতার অভাবকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালে সরকার ১০ বছর মেয়াদী ‘হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করে। এছাড়া ‘সাসটেইনেবল ফরেস্টস অ্যান্ড লাইভলিহুডস’ (এসইউএফএএল) প্রকল্পের অধীনে ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সম্প্রতি কোনো পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও ২০১৬ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন)-এর শুমারি অনুযায়ী, সেই সময় বাংলাদেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি ছিল। এছাড়া ৯৩টি হাতি ছিল আন্তঃসীমান্তীয় (যা ভারত ও মিয়ানমার থেকে যাতায়াত করে) এবং ৯৬টি ছিল বন্দী বা ক্যাপ্টিভ হাতি।
বর্তমানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের মতে, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট এবং নিয়মিত হাতির মৃত্যুর কারণে এই সংখ্যা ২০০-এর নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি)প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক মনিরুল এইচ. খান বলেন, ‘ইআরটি গঠন ভালো উদ্যোগ হলেও মাঠপর্যায়ে এটি কার্যকর নয়। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা সদস্যদের কোনো প্রণোদনা না থাকায় তারা দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন।’
এর পাশাপাশি সরকারি ক্ষতিপূরণ নীতিও ভুক্তভোগীদের খুব একটা সুরক্ষা দিতে পারছে না। সরকারি জমির মালিকানা প্রমাণের আইনি জটিলতায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে ক্ষোভের বশবর্তী হয়েই তারা হাতিকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন প্রাণঘাতী পথ বেছে নিচ্ছেন।

এদিকে সংকট নিরসনে সরকার সম্প্রতি পরিবেশগত আইনকে আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। বন বিভাগের হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রধান এ.এস.এম জহির উদ্দিন আকন জানিয়েছেন, তারা বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পেতে নতুন করে শুমারি করার পরিকল্পনা করেছেন। একইসঙ্গে, ভারত ও বাংলাদেশের প্রটোকল অনুযায়ী আটকে পড়া বহিরাগত হাতিদের সুরক্ষায় প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডের আদলে ক্যাপটিভ হাতিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি অংশকে হাতির সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা এই সংকটের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা জোর দিয়ে বলছেন, কেবল আইনি সুরক্ষা বা বেড়া দিয়ে হাতি বাঁচানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কৌশল। করিডোরগুলোকে আইনগত সুরক্ষা প্রদান, নন-লেথাল ডিটারেন্স বা প্রাণঘাতী নয় এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিস্তার এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে বাস্তুসংস্থান বিষয়ক সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হাতি কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং বনের বাস্তুসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি মানুষ ও হাতির মধ্যকার এই সংঘাতের অবসান না ঘটে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার নিজস্ব বন্য হাতির বিশাল ভাণ্ডার চিরতরে হারাবে। সরকার ও সচেতন মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই মহাবিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করে মানুষ ও হাতির সহাবস্থানের একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে।