
হাসান মাহমুদ: বৈশ্বিক ফ্যাশন ও তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পকে পরিবেশবান্ধব এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লড়াইয়ে বিশ্বমঞ্চে এক ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সুইডেনভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন গ্রুপ এইচ অ্যান্ড এম-এর অর্থায়নে পরিচালিত এইচ অ্যান্ড এম ফাউন্ডেশনের মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড (জিসিএ) ২০২৬’ জয় করেছে বাংলাদেশি টেক-স্টার্টআপ ‘থ্রেডব্রিজ’।
বিশ্বজুড়ে জমা পড়া হাজারো উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মধ্য থেকে কঠোর স্ক্রিনিং ও আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের নিবিড় যাচাই-বাছাই শেষে এ বছরের সেরা ১০টি বৈশ্বিক উদ্ভাবনের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে মো. রিদওয়ান হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই স্টার্টআপটি। পুরস্কার হিসেবে তারা শুধু বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনুদানই পাচ্ছে না, বরং এই প্রযুক্তিকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিতে এক বছরের বৈশ্বিক মেন্টরশিপের সুযোগ পাচ্ছে।
দ্য গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ও পুরস্কারের বিবরণ:
ফ্যাশন দুনিয়ার ‘নোবেল পুরস্কার’ খ্যাত গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড মূলত এমন সব উদ্ভাবনকে দেওয়া হয়, যা ফ্যাশন শিল্পকে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত কার্বন নির্গমনের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখে। ২০২৬ সালের এই আসরে বাংলাদেশের প্রথম কোনো স্টার্টআপ হিসেবে থ্রেডব্রিজ এই গৌরবময় তালিকায় নিজেদের নাম লেখাল। এইচ অ্যান্ড এম ফাউন্ডেশনের এই ‘গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এর বিজয়ী তালিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গত সোমবার (৮ জুন) ঘোষণা করা হয়।
পুরস্কার হিসেবে স্টার্টআপটি লাভ করছে ২ লাখ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা) অনুদান, যা কোনো ইকুইটি বা মালিকানা ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি তারা এক বছর মেয়াদী ‘জিসিএ চেঞ্জমেকার প্রোগ্রাম’-এ অংশ নেবে। যেখানে বিশ্বখ্যাত ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্সি ফার্ম ‘অ্যাকসেঞ্চার’ এবং সুইডেনের ‘কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (কেটিএইচ) থ্রেডব্রিজের এই আইডিয়াটিকে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য কারিগরি ও ব্যবসায়িক পরামর্শ দেবে।
যেভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি:
তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ কাপড়ের অপচয় বা ‘প্রি-কনজিউমার টেক্সটাইল বর্জ্য’ তৈরি হওয়া পোশাক খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। প্রচলিত পদ্ধতিতে কাপড় কেটে পোশাক তৈরির পর কিংবা একদম শেষ ধাপে কোয়ালিটি চেকে কাপড়ের ত্রুটি ধরা পড়ে। ততক্ষণে নষ্ট হওয়া কাপড়টি আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। থ্রেডব্রিজ এই সমস্যার এক যুগান্তকারী ও শ্রমিক-বান্ধব সমাধান নিয়ে এসেছে তাদের এআই-চালিত কোয়ালিটি কন্ট্রোল সিস্টেমের মাধ্যমে।
থ্রেডব্রিজের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিতে কারখানার ফ্লোরে কর্মরত কোয়ালিটি পরিদর্শকরা এক বিশেষ ধরনের পরিধানযোগ্য স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করেন। যখনই কাপড়ের থান বা রোল ফ্লোরে আনা হয়, তখন এই স্মার্ট গ্লাসে যুক্ত কম্পিউটার ভিশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং মডেল কাপড়ের ওপর দিয়ে চোখ বুলানোর সাথে সাথেই রিয়েল-টাইমে যেকোনো সূক্ষ্ম ত্রুটি বা খুঁত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনাক্ত করে পরিদর্শকের চোখের সামনে ডিজিটাল স্ক্রিনে ফুটিয়ে তোলে। এর ফলে, কাপড় কাটিং সেকশনে যাওয়ার আগেই ত্রুটিপূর্ণ অংশটি আলাদা করে ফেলা সম্ভব হয়, যা কাপড়ের অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে।
মাঠ পর্যায়ের সাফল্য ও পরিবেশগত প্রভাব:
থ্রেডব্রিজের প্রতিষ্ঠাতা মো. রিদওয়ান হোসেন জানান, তাদের তৈরি এই প্রযুক্তি কেবল ল্যাবরেটরির গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাংলাদেশের ৪টি বড় তৈরি পোশাক কারখানায় এটি পরীক্ষামূলকভাবে সফলতার সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের এই পাইলট প্রকল্প থেকে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাৎক্ষণিকভাবে কাপড়ের ত্রুটি সনাক্ত করে কাটিং সেকশনের অপচয় রোধ করার মাধ্যমে এই ৪টি কারখানায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি কারখানার কোনো সাধারণ শ্রমিককে প্রতিস্থাপন বা ছাঁটাই করে না। এটি একটি পরিধানযোগ্য ডিভাইস হওয়ায় শ্রমিকরা খুব সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে তাদের কাজের নিখুঁততা ও দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে মালিকপক্ষ যেমন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়, তেমনি বিশ্বমানের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নতুন দিগন্ত:
পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, থ্রেডব্রিজের এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি এমন এক সময়ে এল যখন বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা সংকুচিত হবে, যার ফলে তৈরি পোশাক খাতকে কঠোর প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদন খরচ কমানো এবং কারখানার অটোমেশন বা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় ক্রেতারা এখন পোশাকের গুণগত মানের পাশাপাশি কারখানাটি কতটা পরিবেশবান্ধব এবং কত কম কার্বন নিঃসরণ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে অর্ডার দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে থ্রেডব্রিজের মতো সম্পূর্ণ দেশীয় মেধায় তৈরি এআই প্রযুক্তি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ বা মোড় পরিবর্তনকারী উপাদান হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশ শুধু কম মজুরির সস্তা শ্রমের দেশ নয়, বরং বাংলাদেশ এখন পোশাক খাতের জন্য বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করতে পারে।
পোশাক শিল্পে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর একাধিক কর্মকর্তা ও টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞরা এই অর্জনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের ইমেজকে বিশ্ববাজারে সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এই পুরস্কার। থ্রেডব্রিজের মতো স্টার্টআপগুলোকে যদি সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে নীতিগত এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে দেশের শত শত কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের আরএমজি খাত আগামী দশকের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ সফলভাবে পার করতে পারবে।
এক বছরের আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম শেষ করে থ্রেডব্রিজ যেন খুব দ্রুত দেশের পোশাক খাতের মূলধারায় তাদের এই স্মার্ট গ্লাস প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে, এখন সেটাই বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।